বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী, যিনি ছোটগল্প ও উপন্যাস উভয় ক্ষেত্রেই রেখে গেছেন স্বতন্ত্র শিল্পভাষা ও গভীর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির স্বাক্ষর। তিনি নরেন্দ্রনাথ মিত্র। স্বনামধন্য গল্পকার, কবি ও ঔপন্যাসিক নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ১১১তম জন্মদিনে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
বাংলা ছোটগল্পের পরিমণ্ডলে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্পের বিষয়বস্তু ও কাঠামোগত বিন্যাস কেবল বাংলা ছোটগল্পেই নয়, বিশ্ব ছোটগল্পের সঙ্গেও তুলনীয়। পাঠককে নিমগ্নচিত্তে গল্পপাঠে আবদ্ধ রাখার এক অসামান্য শিল্পশক্তি তাঁর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য। সংখ্যা বিচারে তিনি চার শতাধিক গল্পের স্রষ্টা। তবে কেবল সংখ্যায় নয়, গুণগত দিক থেকেও তাঁর গল্প উৎকৃষ্ট।
তিনি রচনা করেছেন ৫১টি গল্পগ্রন্থ ও ৩৮টি উপন্যাস। তাঁর বহু গল্প হিন্দি, মারাঠি, রুশ, ইংরেজি ও ইতালীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে, যা তাঁর সাহিত্যকর্মের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ।
নরেন্দ্রনাথ মিত্র ১৯১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি, ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার সদরদী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভাঙ্গা হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আইএ এবং কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
লেখালেখির শুরু শৈশবকাল থেকেই। ১৯৩৬ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রথম মুদ্রিত কবিতা ‘মূক’ এবং প্রথম গল্প ‘মৃত্যু ও জীবন’ পাঠকমহলে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্য ও নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জোনাকি’ তাঁর কাব্যপ্রবণতার পরিচয় বহন করে।
তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অসমতল’ এবং প্রথম উপন্যাস ‘হরিবংশ’ (যা পরবর্তীতে ‘দ্বীপপুঞ্জ’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়) সাহিত্যাঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। উপন্যাসগুলোর মধ্যে-‘দ্বীপপুঞ্জ’, ‘চেনামহল’, ‘তিন দিন তিন রাত্রি’ ও ‘সূর্যসাক্ষী’ দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশকাল থেকেই ব্যাপক সমাদৃত হয়।
প্রায় চার দশকের সাহিত্যজীবনে তিনি প্রায় পাঁচশ’ গল্প রচনা করেন। শান্ত-নিস্তরঙ্গ পল্লিজীবন, নগরমুখী মফস্বল শহরের ভাসমান মধ্যবিত্ত এবং মহানগর কলকাতার প্রান্তিক জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল উপজীব্য।
নরেন্দ্রনাথ মিত্রের বহু সাহিত্যকর্ম চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে- সত্যজিৎ রায়ের ‘মহানগর’অগ্রগামীর ‘হেডমাস্টার’ ও ‘বিলম্বিতলয়’রাজেন তরফদারের ‘পালঙ্ক’
তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘রস’ অবলম্বনে নির্মিত হিন্দি চলচ্চিত্র ‘সওদাগর’এ অভিনয় করেন দুনিয়াখ্যাত অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন। গ্রাম্য প্রেক্ষাপটের এক সাধারণ ঘটনাকে কীভাবে উচ্চাঙ্গের শিল্পে উত্তীর্ণ করা যায়‘রস’ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
কর্মজীবনে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগ দেন এবং আমৃত্যু সেখানে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি সাহিত্যক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন।
বাংলা সাহিত্যের এই অসামান্য সৃজনশীল মানুষটি ১৯৭৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রয়াত হন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









