বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিস্ময়কর দিন ১লা ফেব্রুয়ারি। দেশের সাবেক তিন রাষ্ট্রপতির জন্মদিন আজ। এই সাবেক তিন রাষ্ট্রপতি হলেন :হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ ও অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। বাংলাদেশের সাবেক তিন রাষ্ট্রপতির জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা।
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৩০ সালের এই দিনে ভারতের কোচবিহার জেলার দিনহাটায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং একই বছর পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালে প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে ৬ ডিসেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।তিনি ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলে থাকা অবস্থায়ই রংপুরের পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনেও তিনি পাঁচটি আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৯ সালে তিনি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
২০১৯ সালের ১৪ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন।
বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ
বাংলাদেশের প্রখ্যাত আইনবিদ, ষষ্ঠ প্রধান বিচারপতি এবং দু’বার দায়িত্বপালনকারী রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ। তিনি ১৯৩০ সালের এই দিনে নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার পেমই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার নিযুক্ত হন এবং ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে উন্নীত হন। ১৯৭৩–৭৪ সালে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৮০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হন। সংবিধানের ৮ম সংশোধনী মামলায় তার রায় বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনের পথে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে। ১৯৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের গুলিতে হতাহতের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি।
১৯৯০ সালের ৫ ডিসেম্বর মওদুদ আহমেদের পদত্যাগের পর তিনি উপ-রাষ্ট্রপতি হন। ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হলে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নিরপেক্ষ নেতৃত্বে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তিনি আবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে ফিরে যান।
১৯৯৬ সালের ২৩ জুলাই আওয়ামী লীগের মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অবসর নেন।
শাহাবুদ্দিন আহমেদ ২০২২ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। সততা, প্রজ্ঞা ও নিরপেক্ষতার মাধ্যমে তিনি সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করেন।
অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ
অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ বাংলাদেশের ১৮তম রাষ্ট্রপতি। তিনি ১৯৩১ সালের এই দিনে মুন্সীগঞ্জ জেলার নারায়ণগঞ্জ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বিএনপির মনোনয়নে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ৭ বছর ৫ মাস দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর পূর্বসূরি ছিলেন রাষ্ট্রপতি জমির উদ্দিন সরকার এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন মো. জিল্লুর রহমান।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জরুরি অবস্থা জারির প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালের ১২ জানুয়ারি তিনি এ পদ ত্যাগ করেন। তার পরদিন বিশ্বব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরউদ্দিন আহমদ প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। এর আগে ১৯৯১ সালে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯১–৯৩ সালে পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং ১৯৯৫–৯৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তিনি স্টেট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ছিলেন। তিনি যুক্তরাজ্যের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৮৩), জার্মান টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় বার্লিন (১৯৮৪) এবং গ্যাটিঞ্জেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ইব্রাহিম মেমোরিয়াল গোল্ড মেডেল (১৯৮৭–৮৮), শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর গোল্ড মেডেল (১৯৯০), ক্রেস্ট (১৯৯১) এবং শিক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য একুশে পদক (১৯৯৫) লাভ করেন।
২০১২ সালের ১০ ডিসেম্বর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বামরুনগ্রাদ আন্তর্জাতিক হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









