বাংলা সাহিত্যে এমন লেখক খুঁজে পাওয়া দুর্লভ, যিনি একইসঙ্গে বিজ্ঞান, ইতিহাস, স্থাপত্য, শিল্পকলা, মনস্তত্ত্ব, কিশোরসাহিত্য, গোয়েন্দাকাহিনি, ভ্রমণ, এমনকি নেতাজী রহস্য- এত বিচিত্র বিষয়ে স্বচ্ছন্দে লিখে গেছেন।
নিজেকে নিয়ে তাঁর কৌতুকবোধ ছিল অসাধারণ। আত্মজীবনী ‘ষাট একষট্টি’তে তিনি এক মজার ঘটনার কথা লিখেছিলেন, লস অ্যাঞ্জেলসের দুর্গাপুজোর মঞ্চে তাঁকে পরিচয় করাতে গিয়ে কেউ তাঁর বইয়ের নাম জানতে চাইলে তিনি হেসে বলেছিলেন, “বলুন আমি বই-টই লিখি, তাতেই হবে!” বড় পুরস্কারের অভাবে লেখককে গুরুত্ব না দেওয়ার বাঙালি মানসিকতাকে এই রসিকতার মধ্যেই যেন তিনি খোঁচা মেরেছিলেন।
নারায়ণ সান্যাল ১৯২৪ সালের ২৬ এপ্রিল কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেন। শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে পিডব্লিউডিতে চাকরি করেন। দণ্ডকারণ্যে কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই লেখেন ‘বকুলতলা পি এল ক্যাম্প’ ও ‘দণ্ডকশবরী’- উদ্বাস্ত্ত জীবনের হৃদয়স্পর্শী দলিল।
প্রায় ১৪০টিরও বেশি বইয়ের রচয়িতা সান্যালের লেখার পরিসর বিস্ময়কর। বিজ্ঞানভিত্তিক কল্পকাহিনি ‘নক্ষত্রলোকের দেবতাত্মা, তিমি নিয়ে তথ্যনির্ভর সাহিত্য ‘তিমি তিমিঙ্গিল’প্রতিটি বইই গবেষণার দৃঢ় ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে।
গোয়েন্দা সাহিত্যে তাঁর ‘কাঁটা’ সিরিজ পাঠকপ্রিয়। আবার শিশুদের জন্য লিখেছেন যুক্তাক্ষরবর্জিত ‘হাতি আর হাতি’, ‘শার্লক হেবো’, ‘অরিগ্যামি’, ‘ডিজনিল্যান্ড’- যা কিশোরপাঠ্য সাহিত্যে অনন্য সংযোজন।
শিল্প ও ইতিহাস নিয়েও তাঁর অনুরাগ ছিল প্রবল। ‘অজন্তা অপরূপা’, ‘রূপমঞ্জরী’, ‘সত্যকাম’ প্রভৃতি উপন্যাসে শিল্প ও সাহিত্যের মেলবন্ধন দেখা যায়। ‘অজন্তা অপরূপা’ বইটির প্রশংসা করেছিলেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। এ বইয়ের জন্য তিনি ১৯৬৯ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার পান। পরবর্তীতে ‘রূপমঞ্জরী’ উপন্যাসের জন্য পান বঙ্কিম স্মৃতি পুরস্কার।
তাঁর বেশ কিছু লেখা চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে- ‘সত্যকাম’ থেকে হিন্দি ছবি, আর ‘নাগচম্পা’, ‘নীলিমায় নীল’, ‘অশ্লীলতার দায়ে’ প্রভৃতি থেকে বাংলা সিনেমা।
অনেকে তাঁর লেখাকে ‘মৌলিক নয়’ বলে সমালোচনা করলেও তিনি নির্দ্বিধায় উৎসগ্রন্থের উল্লেখ করতেন। জবাবে তিনি বলেছিলেন,“মাকড়সার জাল তাঁর নিজস্ব কীর্তি, মৌমাছির মৌচাক তা নয়… আমি মধুকর বৃত্তিতেই সন্তুষ্ট।”
২০০৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর প্রয়াণ হলেও আজও তাঁর বই পুনর্মুদ্রিত হয়, নতুন পাঠক তৈরি হয়। বনফুল তাঁকে লিখেছিলেন,“সস্তা হাততালি নাইবা পেলেন, বাংলা সাহিত্যের যে উপকার আপনি করলেন, তার মূল্য কমবে না।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









