“মাগো, ওরা বলে / সবার কথা কেড়ে নেবে…”
মায়ের কোলে শুয়ে গল্প শোনার আকুলতা, ভাষা হারানোর আশঙ্কা আর ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি-এই সরল অথচ গভীর উচ্চারণ যেন এক প্রজন্মের হৃদয়ের ভাষা।আবার কখনও আবৃত্তির মঞ্চে ধ্বনিত হয়-“আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি…” স্বপ্ন, সংগ্রাম, আগুনের আলো আর মায়ের স্নেহে ভর করা সেই কণ্ঠস্বর শুধু কবিতা নয়, যেন ইতিহাসের দলিল।
এই পঙ্ক্তিগুলোর স্রষ্টা বাংলা কবিতার এক অনন্য কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। তাঁর কবিতার ভাষা ছিল মন্ত্রোচ্চারণের মতো শক্তিশালী, সংহত ও উদ্দীপ্ত। পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও বিস্ময়ে বলেছিলেন- এমন কবিতা বাংলা ভাষায় সম্ভব, তা তাঁর জানা ছিল না।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, শোষণ আর সংগ্রামের সময়েও তাঁর কণ্ঠ থেমে থাকেনি। তিনি লিখেছেন,রাজশক্তির আঘাতে ভেঙে না পড়ে মানুষ কীভাবে প্রাচীন সংগীতের মতো দৃঢ় হয়ে দাঁড়ায়, কীভাবে পর্বতের মতো উচ্চতা স্পর্শ করে, আর অন্ধকার সন্ত্রাসকে মুছে ফেলে নতুন আলোর দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় এই ছিল তাঁর কবিতার মর্ম।
১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, বরিশালের বাবুগঞ্জের এক গ্রামে জন্ম নেওয়া এই প্রতিভা পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন আধুনিক বাংলা কবিতার উজ্জ্বল নক্ষত্র। ভাষা আন্দোলনের প্রজন্মের সন্তান হওয়ায় তাঁর কবিতায় ছিল স্পষ্ট উচ্চারণ, প্রতিবাদের সুর এবং মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।
তাঁর কাব্যগ্রন্থের তালিকাও সমৃদ্ধ- সাত নরী হার, কখনো রং কখনো সুর, কমলের চোখ, সহিষ্ণু প্রতীক্ষা, আমার সময়, আমার সকল কথা, খাঁচার ভিতর অচিন পাখি প্রতিটি বইয়ে ফুটে উঠেছে সময়, সংগ্রাম ও মানবিকতার নানা রূপ।
শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন মেধার স্বাক্ষর। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে দীর্ঘ প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক জীবন কাটান। সচিব, মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার উচ্চপদ সবখানেই তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন দক্ষতার সঙ্গে।
তিনি তাঁর সাহিত্যকীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৯) ও একুশে পদক (১৯৮৫) লাভ করেন। ২০০১ সালের ১৯ মার্চ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আজ কবির জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









