ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে কিছু নাম উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আগুনঝরা অদম্য সাহস, আত্মত্যাগের গল্প। সেই নামগুলোর একটি- কল্পনা দত্ত।আজ এই অগ্নিকন্যার মৃত্যুবার্ষিকী।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে তিনি ছিলেন এক সাহসী নারীযোদ্ধা, যিনি পুরুষতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা ভেঙে সরাসরি অস্ত্র হাতে লড়াইয়ে নেমেছিলেন। তাঁর জ্বালাময়ী মনোবল আর নির্ভীক নেতৃত্বের জন্যই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে আখ্যা দিয়েছিলেন- ‘অগ্নিকন্যা’।১৯৯৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই সংগ্রামী বিপ্লবী।
১৯১৩ সালের ২৭ জুলাই অবিভক্ত বাংলার চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালীর এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া কল্পনার বেড়ে ওঠা ছিল সহজ-সরল। কিন্তু কৈশোরেই দেশপ্রেমের আগুন তাকে ভিন্ন পথে নিয়ে যায়। ১৯২৯ সালে ম্যাট্রিক পাস করে কলকাতার বেথুন কলেজে ভর্তি হন। সেখানেই শহীদ ক্ষুদিরাম ও কানাইলাল দত্তের বিপ্লবী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুক্ত হন ছাত্ররাজনীতিতে।
মাস্টারদা সূর্য সেনের সঙ্গে পরিচয়ের মধ্য দিয়ে তার জীবন এক নতুন মোড় নেয়। তিনি যোগ দেন সূর্য সেনের প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির চট্টগ্রাম শাখায়। সে সময় নারীদের বিপ্লবী দলে অন্তর্ভুক্ত করা হতো না বললেই চলে। কিন্তু মাস্টারদা নিয়ম ভেঙে কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে গ্রহণ করেন, যা ছিল যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পরবর্তী পর্যায়ে ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের দায়িত্ব দেওয়া হয় কল্পনাকে। অভিযানের প্রস্তুতিতে পুরুষের ছদ্মবেশে এলাকায় নজরদারি করতে গিয়ে ধরা পড়েন তিনি। কারাগারে বসেই শুনতে হয় সহযোদ্ধা প্রীতিলতার আত্মাহুতির খবর।
জামিনে মুক্তির পর আবার আত্মগোপন, কিন্তু ১৯৩৩ সালে পুলিশি অভিযানে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে ধরা পড়েন। বিচারে সূর্য সেনের ফাঁসি হলেও কল্পনা দত্তের ভাগ্যে জোটে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কারাবন্দি কল্পনার মুক্তির জন্য স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গভর্নরের কাছে আবেদন জানান। অবশেষে ১৯৩৯ সালে মুক্তি পান কল্পনা।
জেল থেকে বেরিয়ে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয় থাকেন।
শুধু অস্ত্র নয়, কলমেও ছিল তাঁর সমান দখল। ইংরেজি ও বাংলায় লিখতেন সাবলীলভাবে। ‘পিপলস ওয়ার’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধগুলো সময়ের সমাজ-রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত।
তার স্মৃতিকথা ও গবেষণামূলক গ্রন্থ- ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণকারীদের স্মৃতিকথা’, ‘চট্টগ্রাম অভ্যুত্থান’স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল্যবান ইতিহাস সংরক্ষণ করে রেখেছে।
ভারত-সোভিয়েত সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করেছেন তিনি, অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ রাশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন আদর্শের প্রতি অটল।
কল্পনা দত্ত কেবল একজন বিপ্লবী নন তিনি প্রতিরোধের প্রতীক, নারী শক্তির প্রতীক, স্বাধীনতার অগ্নিশিখা।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









