বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনে যখন দেশ জুড়ে ছিল ভয়, অনিশ্চয়তা আর সংগ্রামের ধ্বনি, তখন মানুষের হৃদয়ে সাহস জুগিয়েছিলেন কয়েকজন কণ্ঠযোদ্ধা। সেই কণ্ঠযোদ্ধাদের একজন কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বার। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী শুধু গান গেয়েই থেমে থাকেননি, তিনি হয়ে উঠেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার বাতিঘর।
১৯৩৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়া জেলায় জন্ম নেওয়া আব্দুল জব্বার ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর কণ্ঠই হয়ে ওঠে দেশাত্মবোধ আর সংগ্রামের প্রতীক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে একের পর এক প্রেরণাদায়ী গান গেয়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মনে জাগিয়ে তোলেন সাহস ও দেশপ্রেম। তার গানে অনুপ্রাণিত হয়ে অসংখ্য তরুণ অস্ত্র হাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও তিনি বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন। ভারতীয় কিংবদন্তি শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে মুম্বাইয়ের বিভিন্ন স্থানে অংশ নেন সচেতনতামূলক সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তার কণ্ঠের ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’এমন বহু গান আজও মুক্তিযুদ্ধের স্মারক হয়ে বেঁচে আছে। ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’ গানটি মানুষের হৃদয়ে অন্যরকম আবেদন তৈরি করে। ২০০৬ সালে বিবিসি বাংলার শ্রোতা জরিপে তার গাওয়া তিনটি গান সর্বকালের সেরা ২০ বাংলা গানের তালিকায় স্থান পায় যা তার জনপ্রিয়তা ও শিল্পসত্তার স্বীকৃতি।
চলচ্চিত্রেও ছিল তার সফল পদচারণা। ১৯৬৪ সালে ‘সঙ্গম’ ছবির মাধ্যমে প্লেব্যাক যাত্রা শুরু করে ‘এতটুকু আশা’, ‘পীচ ঢালা পথ’, ‘ঢেউয়ের পর ঢেউ’একটির পর একটি জনপ্রিয় গান উপহার দেন তিনি। আর ১৯৭৮ সালের ‘সারেং বৌ’ চলচ্চিত্রের ‘ও রে নীল দরিয়া’ গানটি যেন তাকে অমরত্ব এনে দেয়।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি লাভ করেন একুশে পদক (১৯৮০) ও স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৬), বাচসাস পুরস্কার (২০০৩), সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস - আজীবন সম্মাননা (২০১১), জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার সহ বহু সম্মাননা।
২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট এই কালজয়ী শিল্পী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বারের জন্মদিবসে গভীর শ্রদ্ধা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









