বাংলা কবিতার দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র, দুই ভিন্ন সময়ের দুই স্বতন্ত্র কণ্ঠ ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এবং গণমানুষের কবি আসাদ চৌধুরীর জন্মদিন আজ। একজন বাংলা কাব্যে ছন্দের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন, অন্যজন মানুষের সুখ-দুঃখ, মুক্তিযুদ্ধ ও মাটির গন্ধমাখা জীবনকে তুলে ধরেছেন কবিতার ভাষায়। বাংলা সাহিত্যের এই দুই কৃতিমান কবিকে জন্মদিনে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও স্মরণ।
ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
বাংলা কাব্যে ছন্দের অনন্য জাদু সৃষ্টি করে যিনি ‘ছন্দের জাদুকর’ ও ‘ছন্দোরাজ’ নামে খ্যাতি পেয়েছেন, কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ১৮৮২ সালের এই দিনে কলকাতার নিকটবর্তী নিমতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
শিক্ষাজীবনে সেন্ট্রাল কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স এবং স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে এফএ পাস করেন। ভারতী পত্রিকাগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে তিনি বাংলা কবিতায় নতুন ছন্দ নির্মাণ ও উদ্ভাবনে অসামান্য দক্ষতা দেখান। বাংলা ভাষার নিজস্ব ধ্বনি, বাগধারা এবং আরবি-ফারসি শব্দের সৃজনশীল মিশ্রণে কাব্যভাষাকে সমৃদ্ধ করেন। তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘ছন্দ-সরস্বতী’ বাংলা ছন্দতত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
দেশাত্মবোধ, মানবপ্রেম, ঐতিহ্যচেতনা এবং সাধারণ মানুষের জীবন তার কবিতার মূল উপজীব্য। একইসঙ্গে আরবি, ফারসি, চীনা, জাপানি, ইংরেজি ও ফরাসি কবিতার অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে বিশ্বসাহিত্যের সেতুবন্ধন গড়ে তোলেন তিনি।
‘সবিতা’, ‘সন্ধিক্ষণ’, ‘বেণু ও বীণা’, ‘ফুলের ফসল’, ‘কুহু ও কেকা’, ‘বেলা শেষের গান’সহ অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ তার সৃজনশীলতার সাক্ষ্য বহন করে। ১৯২২ সালের ২৫ জুন তিনি পরলোকগমন করেন।
গণমানুষের কবি আসাদ চৌধুরী
আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর, কবি-শিশু সাহিত্যিক-সাংবাদিক ও আবৃত্তিকার আসাদ চৌধুরী। গণমুখী, নান্দনিক ও রোমান্টিক ধাঁচের লেখনির মাধ্যমে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বাংলার লোকজ জীবনকে গভীর মমতায় তুলে ধরেছেন।
১৯৪৩ সালের এই দিনে বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। উলানিয়া হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক, বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনের শুরুতে শিক্ষকতা করলেও পরে সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতি অঙ্গনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘প্রচ্ছদ’ উপস্থাপনা করেন। ভয়েজ অব জার্মানীর বাংলাদেশ সংবাদদাতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে বাংলা একাডেমিতে পরিচালক হিসেবে কাজ শেষে অবসর নেন।
কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধসহ সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর বিচরণ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে তবক দেওয়া পান, জলের মধ্যে লেখাজোখা, আমার কবিতা, ভালোবাসার কবিতা, প্রেমের কবিতা, দুঃখীরা গল্প করেসহ বহু সৃষ্টি। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচনাও বিশেষভাবে সমাদৃত।
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৭) ও একুশে পদক (২০১৩) লাভ করেন।
২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর কানাডার টরন্টোতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবুও তাঁর কবিতা ও কণ্ঠ আজও বেঁচে আছে বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের হৃদয়ে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









