বাংলা সাহিত্যের প্রগতিশীল ধারার শক্তিমান কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সার। ১৯২৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ফেনী জেলার সোনাগাজি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের মাজুপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্ণ নাম আবু নঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। পিতা মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ এবং মাতা সৈয়দা সুফিয়া খাতুন।
শিক্ষাজীবনের শুরু সরকারি মডেল স্কুলে। পরে ভর্তি হন মাদরাসা-ই-আলিয়ার অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগে। ১৯৪২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি কলেজে থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন (১৯৪৬)। উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। একই সময়ে রিপন কলেজে (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজ) আইন অধ্যয়ন শুরু করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন কিন্তু রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতাজনিত ব্যস্ততায় তা সমাপ্ত হয়নি।
শহীদুল্লাহ কায়সার ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে সক্রিয় রাজনীতির সূচনা করেন এবং পরে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন। ‘দেশপ্রেমিক’ ও ‘বিশ্বকর্মা’ ছদ্মনামে রাজনৈতিক প্রবন্ধ ও উপ-সম্পাদকীয় লিখতেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে ৩ জুন গ্রেফতার হন এবং সাড়ে তিন বছর কারাদণ্ড ভোগ করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক আইন জারির পর ১৪ অক্টোবর আবারও আটক হন এবং ১৯৬২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত জননিরাপত্তা আইনে কারাবন্দি ছিলেন।
১৯৪৯ সালে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পরিচালিত সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে সাংবাদিকতা শুরু করেন। পরে ১৯৫৮ সালে দৈনিক সংবাদ’র সম্পাদকীয় বিভাগে সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।
শহীদুল্লাহ কায়সারের সাহিত্যকর্মে ফুটে উঠেছে গ্রামীণ জীবন, শ্রেণিসংগ্রাম, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবিক টানাপোড়েন। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে- সারেং বৌ, সংশপ্তক, কৃষ্ণচূড়া মেঘ, তিমির বলয়, দিগন্তে ফুলের আগুন, সমুদ্র ও তৃষ্ণা, চন্দ্রভানের কন্যা
‘সংশপ্তক’ তাকে বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করে যেখানে ইতিহাস ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম একাকার হয়েছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষলগ্নে ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর আল-বদর বাহিনীর সদস্যরা তাকে ঢাকার ২৯, বি কে গাঙ্গুলী লেনের বাসা থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি। ধারণা করা হয়, বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েই তিনি শহীদ হন। জাতি তাকে শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।
সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জন করেন- আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬২), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৯), একুশে পদক (১৯৮৩, মরণোত্তর), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৮, মরণোত্তর)।
একাধারে সংগ্রামী রাজনীতিক, নির্ভীক সাংবাদিক ও মানবিক কথাসাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সার জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









