মুকুন্দ দাস একজন বাঙালি যিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় বহু স্বদেশী বিপ্লবাত্মক গান ও নাটক রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন, স্বদেশী যাত্রার প্রবর্তক। প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন চারণ কবি ছিলেন।
১৮৭৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণার বানরী গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা গুরুদয়াল দে ও মাতা শ্যামাসুন্দরী দেবীর সন্তান মুকুন্দের জন্মের কিছুদিন পরেই পদ্মার ভাঙনে গ্রাম বিলীন হলে পরিবার বরিশালে পিতার কর্মস্থলে চলে আসে। সেখানকার ব্রজমোহন স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা।
বরিশালে বৈষ্ণব সন্ন্যাসী রামানন্দ অবধূত যজ্ঞেশ্বরের কণ্ঠে হরিসংকীর্তন ও শ্যামাসঙ্গীত শুনে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন। সেই সাধকের কাছেই দীক্ষা নিয়ে তিনি ‘মুকুন্দদাস’ নাম গ্রহণ করেন। মাত্র উনিশ বছর বয়সেই তিনি একশোটি সাধনসঙ্গীত সম্বলিত গ্রন্থ সাধন-সঙ্গীত রচনা করেন। পাশাপাশি তিনি ‘বরিশাল হিতৈষী’ পত্রিকায় লিখতেন এবং যাত্রাগানে বরিশাল মাতিয়ে রাখতেন।
স্বদেশি ও অসহযোগ আন্দোলনের যুগে মুকুন্দ দাস একের পর এক বিপ্লবাত্মক গান ও নাটক রচনা করে জনমানসে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালান। তিনি স্বদেশি যাত্রার প্রবর্তক এবং প্রকৃত অর্থে একজন কবিয়াল। তাঁর চারণানুষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত অর্থে বরিশালের কাশীপুর কালীমন্দিরের জমি ক্রয় করা হয় আজ যা নথুলাবাদ বাস টার্মিনাল সংলগ্ন ‘চারণকবি মুকুন্দ দাসের কালীবাড়ি’ নামে পরিচিত। একসময়ের ৮৭ শতাংশ জায়গা বর্তমানে মাত্র ১৯ শতাংশে সীমিত হলেও এখানে এখনো ছাত্রাবাস, গ্রন্থাগার, দাতব্য চিকিৎসালয় ও পূজামন্দির বিদ্যমান।
বরিশালের দেশনেতা অশ্বিনীকুমার দত্তের সংস্পর্শে এসে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। তাঁর অনুপ্রেরণায় মুকুন্দ দাস রচনা করেন বিখ্যাত নাটক মাতৃপূজা, যার প্রথম যাত্রাভিনয় দুর্গাপূজার মহাসপ্তমীতে নবগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তাঁর গান, কবিতা ও নাটক বাঙালির জাতীয় জীবনে নতুন উদ্দীপনা জাগায়।
ব্রিটিশ সরকার তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে শঙ্কিত হয়ে রাজদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে এবং দিল্লি কারাগারে আড়াই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। মাতৃপূজা নাটকটি বাজেয়াপ্ত করা হয়। তাঁর দেশপ্রেমিক সত্তাকে সম্মান জানিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম তাঁকে “বাংলা মায়ের দামাল ছেলে” এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে “চারণসম্রাট” উপাধিতে ভূষিত করেন।
কারাবাসের সময় তাঁর স্ত্রী সুভাষিণী দেবীর মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। মুক্তিলাভের পর চিত্তরঞ্জন দাশ ও সুভাষচন্দ্র বসু তাঁকে সান্ত্বনা ও প্রেরণা দেন, ফলে তিনি পুনরায় সাহিত্য-সাধনায় মনোনিবেশ করেন।
১৯৩৪ সালের ১৮ মে শুক্রবার এই চারণকবির জীবনাবসান ঘটে। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে- মাতৃপূজা, সমাজ, আদর্শ, পল্লীসেবা, সাথী, কর্মক্ষেত্র, ব্রহ্মচারিণী, পথ প্রভৃতি।
মুকুন্দ দাস কেবল একজন কবি বা নাট্যকার নন; তিনি ছিলেন স্বদেশি চেতনার জাগরণ-সেনানী, যিনি গান ও যাত্রার মঞ্চকে রূপ দিয়েছিলেন জাতীয় মুক্তির আহ্বানে। জন্মদিনে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









