রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২- নম্বরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিক্ষোভ মিছিল শেষে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ‘দৈনিক সকাল’ পত্রিকার সাংবাদিক মাহফুজুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকালে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ধানমন্ডি জোনের উদ্যোগে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আয়োজিত এই মিছিলের শেষ পর্যায়ে এ অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এ সময় ওই সংবাদকর্মীকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে চড়াও হয় মিছিলকারীরা।
হামলায় ওই সংবাদকর্মীর পরনের পোশাক ছিঁড়ে যায় এবং নাক ও ঠোঁটে গুরুতর আঘাত পায়।
ঘটনার পর ভুক্তভোগী সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, ‘কর্মসূচি চলাকালে কিছু ব্যক্তি তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘লীগ’ আখ্যা দেয়। এরপর কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা তার ওপর চড়াও হয় এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মারধর করতে শুরু করে।’

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ‘দ্য নিউজ’-এর মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মারুফ ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, সকালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে একটি ফ্যাসিবাদবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এরই একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে একজন বক্তা সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “যারা ভিডিও করবেন না, তারা চলে যান।”
বক্তার এমন মন্তব্যের পর সেখানে উপস্থিত সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান তাৎক্ষণিক এর প্রতিবাদ জানান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমরা তো আপনাদের কর্মী নই যে আপনারা যা বলবেন তাই করব।” তার এই প্রতিবাদের পরপরই মূলত পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং হামলার ঘটনা ঘটে।
মারুফের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই প্রতিবাদের পরপরই পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বেশ কয়েকজন ব্যক্তি মাহফুজুর রহমানকে ‘লীগ’ আখ্যা দিয়ে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেন এবং তাকে জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় উপস্থিত অন্য সাংবাদিকরা দ্রুত মাহফুজুর রহমানকে রক্ষা করতে চারপাশ থেকে ঘিরে দাঁড়ালে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এর আগেই হামলাকারীদের সাথে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তার টি-শার্টের বেশ কিছু অংশ ছিঁড়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, টি-শার্ট ছিঁড়ে যাওয়ার পর মাহফুজুর রহমান পুনরায় এই অন্যায়ের প্রতিবাদ জানালে হামলাকারীরা আরও উগ্র হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাকে প্রকাশ্য রাস্তায় ফেলে বেধড়ক মারধর করা হয়। এ সময় তাকে রক্ষা করতে অন্য গণমাধ্যমকর্মীরা এগিয়ে গেলে তারাও ধাক্কাধাক্কি ও হেনস্তার শিকার হন।
মারুফ দাবি করেন, মাহফুজকে বাঁচাতে গিয়ে তিনিও লাথির আঘাত পান এবং রাস্তায় পড়ে যান।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক গণমাধ্যমকর্মী অভিযোগ করেন, শুধুমাত্র ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ করার অপরাধে সাংবাদিক মাহফুজুর রহমানকে লক্ষ্য করে দুই দফায় সুপরিকল্পিতভাবে ‘মব’ বা উগ্র জনতা তৈরি করা হয়। প্রকাশ্য রাস্তায় সংবাদকর্মীর ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে গণমাধ্যমকর্মীরা কর্মসূচির মূল সংবাদ সংগ্রহ বর্জন করে ঘটনাস্থল থেকে সরে যান এবং এই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান।
এদিকে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে দাবি করেছেন ধানমন্ডি থানা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মুজিবুর রহমান খান। গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের এই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বহিরাগত কেউ ঢুকে পড়ে এমন অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।
তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত বেশ কয়েকজন সাংবাদিক আয়োজকদের এই বক্তব্যের সঙ্গে তীব্র দ্বিমত পোষণ করেন। তারা অভিযোগ তোলেন, হামলাকারীদের আড়াল করতে এবং ঘটনার সুনির্দিষ্ট দায় এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই এখন অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
ঘটনার বিভিন্ন স্থিরচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন, হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজনকে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গেছে। তাদের একজন সাদা পাঞ্জাবি ও টুপি পরিহিত ছিলেন, দ্বিতীয়জন হালকা ধূসর রঙের টি-শার্ট পরা মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি এবং তৃতীয়জন নীল রঙের জার্সি পরিহিত এক যুবক। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, নীল জার্সি পরা ওই যুবকের জার্সির পেছনে ‘সোহান’ নাম লেখা ছিল।
এ ঘটনায় উপস্থিত বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী সাংবাদিকের ওপর হামলার নিন্দা জানান এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করেন।
এ বিষয়ে ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে কোনো সাংবাদিকের ওপর হামলার বিষয়ে তার কাছে তথ্য নেই।
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় ধানমন্ডি এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









