এক সময় প্রযুক্তি গবেষণার সীমিত একটি বিষয় ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কিন্তু বর্তমানে এটি বিশ্ব অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং ব্যবসায়িক কাঠামোকে প্রভাবিত করছে।
কয়েক বছরের ব্যবধানে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে লেখা তৈরি থেকে শুরু করে ছবি আঁকা, সফটওয়্যার নির্মাণ, তথ্য বিশ্লেষণ কিংবা গ্রাহকসেবা এবং সব ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, কনটেন্ট নির্মাণ, গ্রাহকসেবা এবং আউটসোর্সিংভিত্তিক নানা পেশার সঙ্গে যুক্ত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার এসব খাতের ভবিষ্যৎকে নতুন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের নতুন ধাপ
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে- সংবাদ খসড়া তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ, গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর, সফটওয়্যার কোড লেখা, ভিডিও সম্পাদনা, এমনকি বিপণন পরিকল্পনাও করা সম্ভব হচ্ছে।
ফলে যেসব কাজ নিয়মভিত্তিক, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং পূর্বনির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেগুলো সবচেয়ে বেশি পরিবর্তনের মুখে পড়েছে।
কোন চাকরিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এমন কাজগুলো যেখানে সৃজনশীল সিদ্ধান্তের চেয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুসরণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যেমন- সাধারণ তথ্য এন্ট্রি, প্রাথমিক পর্যায়ের গ্রাহকসেবা, সাধারণ কনটেন্ট লেখা, অনুবাদের কিছু ক্ষেত্র, বেসিক ডিজাইন, নিয়মিত অফিসভিত্তিক পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দুই ধরনের প্রভাব ফেলছে।
প্রথমত, সাধারণ ও সহজ কাজের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। কারণ এখন একজন ব্যক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় আগের তুলনায় অনেক বেশি কাজ দ্রুত করতে পারছেন।
দ্বিতীয়ত, নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দক্ষভাবে ব্যবহার করতে পারছেন, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি উৎপাদনশীল হয়ে উঠছেন।
তাহলে কি নতুন চাকরিও তৈরি হচ্ছে?
ইতিহাস বলছে, বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন কখনো শুধু চাকরি কমায় না; বরং নতুন পেশাও তৈরি করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বর্তমানে নতুন যেসব ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তদারকি, তথ্য যাচাই, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা, উন্নত সৃজনশীল কনটেন্ট নির্মাণ, সাইবার নিরাপত্তা, প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণা, মানবিক যোগাযোগভিত্তিক সেবা।
অর্থাৎ প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই এমন কাজের মূল্য বাড়ছে যেখানে মানবিক বিচারবোধ, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা প্রয়োজন।
সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে উঠবে কোন দক্ষতা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে- সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজের সক্ষমতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা।
কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য তৈরি করতে পারে, কিন্তু মানুষের মতো সামাজিক বাস্তবতা, আবেগ কিংবা নৈতিক জটিলতা পুরোপুরি বুঝতে পারে না।
মানুষ বনাম প্রযুক্তি নয়, মানুষ ও প্রযুক্তির সমন্বয়
বিশ্ব এখন ধীরে ধীরে এমন এক মডেলের দিকে যাচ্ছে যেখানে মানুষ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একসঙ্গে কাজ করবে। প্রযুক্তি সহকারী হিসেবে উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, আর মানুষ থাকবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সৃজনশীলতা, কৌশল এবং মানবিক যোগাযোগের জায়গায়।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল হবে তারা, যারা প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে সেটিকে নিজের দক্ষতার অংশে পরিণত করতে পারবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চাকরি কেড়ে নিচ্ছে, এ কথা যেমন সত্য, তেমনি নতুন ধরনের কাজও তৈরি করছে, এটাও বাস্তবতা। প্রকৃত পরিবর্তনটি হচ্ছে শ্রমবাজারের কাঠামোতে।
যেসব কাজ নিয়মভিত্তিক ও সহজে স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব, সেগুলো সবচেয়ে বেশি পরিবর্তিত হবে। আর যেসব কাজে মানবিক চিন্তা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব এবং জটিল সিদ্ধান্ত প্রয়োজন সেগুলোর গুরুত্ব আরও বাড়বে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিকে থামানো নয়; বরং এমন দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা, যারা পরিবর্তিত বাস্তবতায় নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে।
কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে টিকে থাকবে তারা, যারা শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করবে না, প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করতেও শিখবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









