কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিশাল আকারের ডেটা সেন্টার নির্মাণ। তবে এসব কেন্দ্র শুধু বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার করছে না, পরিবেশেও ফেলছে তাপের প্রভাব।
কেমব্রিজের নেতৃত্বাধীন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ডেটা সেন্টারের আশপাশের ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। কিছু এলাকায় এ বৃদ্ধির পরিমাণ ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে। গবেষকরা এই প্রভাবকে নাম দিয়েছেন ‘ডেটা হিট আইল্যান্ড এফেক্ট’।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই ডেটা সেন্টারগুলো কোথায় অবস্থিত, কতটা শক্তি ব্যবহার করে এবং আশপাশের মানুষের ওপর এর প্রভাব কী—এসব বিষয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিপুল শক্তি ব্যবহার করে এআই ডেটা সেন্টার
চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা ক্লডের মতো এআই সেবা ব্যবহারের সময় ব্যবহারকারীর অনুরোধগুলো পরিচালিত হয় ডেটা সেন্টারের মাধ্যমে। এসব বিশাল স্থাপনায় থাকা বিশেষায়িত কম্পিউটার দিনে ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। এআই মডেল পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত শক্তিশালী চিপগুলো একসঙ্গে হাজার হাজার গণনা সম্পন্ন করে। ফলে সাধারণ সার্ভারের তুলনায় এসব ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ব্যবহার অনেক বেশি।

আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের ডেটা সেন্টারগুলো প্রায় ৪১৫ টেরাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে। যা বৈশ্বিক বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ১.৫ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে এ ব্যবহার বছরে প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে।
হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারের চাপ
গুগল, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট ও মেটার মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যে বিশাল ডেটা সেন্টার তৈরি করছে, সেগুলোকে বলা হয় ‘হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার’। আইবিএমের তথ্য অনুযায়ী, এসব কেন্দ্রে সাধারণত কমপক্ষে ৫ হাজার সার্ভার থাকে এবং জায়গা লাগে অন্তত ১০ হাজার বর্গফুট।
একটি হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার চালাতে সাধারণত ১০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। এত বিপুল শক্তি ব্যবহারের ফলে তৈরি হয় প্রচুর তাপ, যা নিয়ন্ত্রণে উন্নত শীতলীকরণ ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়। এ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয় বিপুল পরিমাণ পানি।
যুক্তরাজ্য সরকারের ডিজিটাল টেকসই উন্নয়নবিষয়ক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার বছরে প্রায় ২৫০ কোটি লিটার পানি ব্যবহার করতে পারে, যা প্রায় ৮০ হাজার মানুষের বার্ষিক পানির চাহিদার সমান।
কোথায় রয়েছে এআই ডেটা সেন্টার?
২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ১১ হাজার ৬০০-এর বেশি ডেটা সেন্টার চালু রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে—৪ হাজার ৩০০-এর বেশি। ইউরোপে সবচেয়ে বেশি ডেটা সেন্টার রয়েছে যুক্তরাজ্যে, যেখানে ৫৪০টির বেশি কেন্দ্র রয়েছে। এর পর রয়েছে জার্মানি (৫২০-এর বেশি) এবং ফ্রান্স (৩৯০-এর বেশি)। এশিয়ায় চীনে ৩৬০-এর বেশি এবং ভারতে ৩০০-এর বেশি ডেটা সেন্টার রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও দ্রুত বর্ধনশীল বাজার হিসেবে উঠে আসছে।
সিনার্জি রিসার্চ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৭০০ থেকে বেড়ে ১ হাজার ২৯৭টিতে দাঁড়িয়েছে।
১০ কিলোমিটার পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে তাপ
কেমব্রিজ, নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে, একটি এআই ডেটা সেন্টারের আশপাশে তাপমাত্রা গড়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। এর প্রভাব প্রায় ১০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে।
গবেষকরা ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নাসার স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বের ১১ হাজারের বেশি ডেটা সেন্টারের অবস্থানের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখেছেন।

৬ হাজার ৭৩৩টি ডেটা সেন্টারের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, এসব কেন্দ্র চালুর পর আশপাশের তাপমাত্রা ০.৩ থেকে ৯.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে।
গবেষকদের মতে, ডেটা সেন্টারের ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বসবাসকারী ৩৪ কোটির বেশি মানুষ এ উষ্ণতার প্রভাবে পড়তে পারেন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি, বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ
এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল বিনিয়োগ করছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, অ্যালফাবেট ও মেটা—এই চার হাইপারস্কেল প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে প্রায় ৫.৩ ট্রিলিয়ন ডলার মূলধনী ব্যয় করতে পারে।
বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায় মেটার ২৭ বিলিয়ন ডলারের হাইপেরিয়ন ক্যাম্পাস, উইসকনসিনে মাইক্রোসফটের ২০ বিলিয়ন ডলারের ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণ, মিসিসিপিতে অ্যামাজনের ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং মিসৌরিতে গুগলের ১৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প।
এ ছাড়া টেক্সাসের অ্যাবিলিনে ওপেনএআই, সফটব্যাংক ও ওরাকলের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে ‘প্রজেক্ট স্টারগেট’, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এআই অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্র : আলজাজিরা


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









