সিঙ্গাপুরের একদল পদার্থবিদ এমন এক পারমাণবিক ঘড়ি তৈরি করেছেন, যা সময় মাপার নির্ভুলতায় নতুন রেকর্ড গড়েছে। একটি মাত্র লুটেটিয়াম আয়ন ব্যবহার করে তৈরি এই ঘড়ি এতটাই নির্ভুল যে তাত্ত্বিকভাবে এটি ২৬০ বিলিয়ন বছর চললেও মাত্র এক সেকেন্ডের হেরফের করবে। এর নির্ভুলতা ১৯তম দশমিক ঘর পর্যন্ত পৌঁছেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ন্যাচার সাময়িকীতে।
এই ঘড়ির বিশেষত্ব শুধু সময় নির্ভুলভাবে মাপায় নয়। মাত্র কয়েক মিলিমিটার উচ্চতার পার্থক্যের কারণে মহাকর্ষের প্রভাবে সময়ের যে সামান্য পরিবর্তন ঘটে, সেটিও এটি শনাক্ত করতে পারে। ফলে পৃথিবীর ভূগর্ভের কাঠামো অনুসন্ধান থেকে শুরু করে ডার্ক ম্যাটারের মতো মহাজাগতিক রহস্য গবেষণায়ও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
পরমাণুর স্পন্দনেই সময়ের হিসাব
মানুষ একসময় সূর্য, চাঁদ কিংবা দোলকের ওঠানামা দেখে সময় মাপত। আধুনিক বিজ্ঞানে সেই কাজ করে পরমাণু। কোনো পরমাণুর ইলেকট্রন এক শক্তিস্তর থেকে অন্যটিতে গেলে নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের আলো শোষণ বা নির্গত হয়। এই নির্দিষ্ট কম্পনকে কাজে লাগিয়েই তৈরি হয় পারমাণবিক ঘড়ি।
১৯৬০-এর দশক থেকে সময়ের আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণে সিজিয়ামভিত্তিক ঘড়ি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পরে বিজ্ঞানীরা দৃশ্যমান লেজার আলো ব্যবহার করে আরও দ্রুতগতির অপটিক্যাল অ্যাটমিক ক্লক তৈরি করেন। আলোর কম্পাঙ্ক অত্যন্ত বেশি হওয়ায় এসব ঘড়ি সময়কে আরও সূক্ষ্মভাবে মাপতে পারে।
কিন্তু ঘড়ির পরমাণুগুলো তাপ, চৌম্বক ও বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের মতো পরিবেশগত প্রভাবে সামান্য পরিবর্তিত হয়। এই সমস্যার সমাধানেই লুটেটিয়াম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

লুটেটিয়ামের বিশেষ ক্ষমতা
লুটেটিয়াম একটি ভারী মৌল। এর নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ শক্তিস্তর পরিবর্তন ঘরের তাপমাত্রা ও বিচ্ছিন্ন চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে তুলনামূলকভাবে কম পরিবর্তিত হয়। ভারী হওয়ায় উত্তপ্ত অবস্থায় এর গতিও কম থাকে, ফলে গতিজনিত দ্বিতীয়-ক্রমের ডপলার পরিবর্তন অনেকাংশে কমে যায়।
গবেষকেরা আরও ব্যবহার করেছেন ‘হাইপারফাইন অ্যাভারেজিং’ কৌশল। লেজার ও মাইক্রোওয়েভের পালাক্রমিক পালস দিয়ে এমনভাবে পরিমাপ করা হয়, যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত চৌম্বক ও বৈদ্যুতিক প্রভাব পরস্পরকে বাতিল করে দেয়।
তবে এতেই গবেষকেরা সন্তুষ্ট হননি। নির্ভুলতা যাচাই করতে তাঁরা পাশাপাশি দুটি সম্পূর্ণ স্বাধীন লুটেটিয়াম ঘড়ি তৈরি করে প্রায় ২০০ ঘণ্টা ধরে একে অপরের সঙ্গে তুলনা করেন।
লেজারের সামান্য কম্পনও যাতে ফলাফলে প্রভাব না ফেলে, একটি লেজার রশ্মিকে দুই ভাগ করে একই মুহূর্তে দুই ঘড়িতে পাঠানো হয়। ফলে লেজারের সাধারণ কম্পন দুই ঘড়ির ক্ষেত্রেই একইভাবে কাজ করে এবং তুলনার সময় তা বাতিল হয়ে যায়। পরীক্ষায় দুই ঘড়ির ফল অসাধারণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের পদার্থবিদ মারে ব্যারেটের মতে, লুটেটিয়ামের বৈশিষ্ট্য এতটাই উন্নত যে এই ঘড়িকে ভবিষ্যতে আরও নির্ভুল করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।
চার মিলিমিটারেও ধরা পড়ে মহাকর্ষ
এই গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকটি আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত। মহাকর্ষ যত শক্তিশালী, সময় তত ধীরে চলে। তাই মেঝেতে থাকা একটি ঘড়ি টেবিলের ওপর থাকা ঘড়ির তুলনায় সামান্য ধীরে চলে।
সিঙ্গাপুরের নতুন ঘড়ি এতটাই সংবেদনশীল যে গবেষকেরা মাত্র প্রায় চার মিলিমিটার উচ্চতার পার্থক্যের কারণে দুই আয়নের ঘড়ির গতিতে পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন। ফলে ঘড়ি দুটির তুলনা করার সময় আয়নগুলোর উচ্চতা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মেপে মহাকর্ষজনিত পার্থক্যের হিসাব সংশোধন করতে হয়েছে।
ঘড়ি দিয়েই পড়া যাবে পৃথিবীর ভেতর
এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ভূবিজ্ঞানে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বহনযোগ্য এমন ঘড়ি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গিয়ে মহাকর্ষের অতি ক্ষুদ্র পরিবর্তন মাপা সম্ভব হলে ভূগর্ভের অদৃশ্য কাঠামোও শনাক্ত করা যেতে পারে।
এর মাধ্যমে আগ্নেয়গিরির নিচে ম্যাগমার অবস্থান, টেকটোনিক ফল্টের পরিবর্তন কিংবা সমুদ্রপৃষ্ঠের সূক্ষ্ম উচ্চতা পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে। এই পদ্ধতিকে বলা হচ্ছে ‘মিলিমিটার-স্কেল ক্রোনোমেট্রিক লেভেলিং’।

ডার্ক ম্যাটারের সন্ধানেও নতুন সম্ভাবনা
পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এমন অত্যন্ত নির্ভুল ঘড়ির নেটওয়ার্ক তৈরি করা গেলে মহাকর্ষ ও স্থান-কালের অতি সূক্ষ্ম পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য সংকেত খোঁজা এবং মহাবিশ্বের ইতিহাসজুড়ে পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়ম ও ধ্রুবকগুলো অপরিবর্তিত ছিল কি না, তাও পরীক্ষা করা যেতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে ‘সেকেন্ড’-এর সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে লুটেটিয়াম-ভিত্তিক ঘড়ি ভবিষ্যতের সময়ের মানদণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হয়ে উঠেছে।
তবে এর আগে দরকার প্রযুক্তিটিকে গবেষণাগারের বাইরে নিয়ে যাওয়া। গবেষকদের পরবর্তী লক্ষ্য হলো বর্তমান ব্যবস্থাকে ছোট করে একটি পরিবহনযোগ্য ঘড়ি তৈরি করা, যাতে আকার কমলেও এর অসাধারণ নির্ভুলতা বজায় থাকে।
সময়কে এতদিন আমরা কেবল মাপার একটি বিষয় হিসেবে দেখেছি। লুটেটিয়ামের এই অতিনির্ভুল ঘড়ি দেখাচ্ছে, সময় নিজেই হতে পারে পৃথিবীর গভীরতম রহস্য এবং মহাবিশ্বের অদৃশ্য বাস্তবতা অনুসন্ধানের এক নতুন বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









