দেশের মানুষ যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয়-ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে লড়াই করছে, তখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে নতুন এক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সরকার ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বলছে, ভর্তুকির চাপ কমানো এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি অপরিহার্য ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিদ্যুৎ খাতের সংকটের সমাধান কি কেবল জনগণের পকেট থেকেই খুঁজে বের করতে হবে?
গত বুধবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন দাম ঘোষণা করে বিইআরসি। পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, সঞ্চালন চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। নতুন দাম জুন থেকেই কার্যকর হবে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি হতাশার বিষয় হলো, এর বোঝা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশের ওপরও সমানভাবে চাপানো হয়েছে। যে পরিবার মাসে ৫০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে না, যাদের ঘরে হয়তো একটি ফ্যান আর কয়েকটি বাতিই একমাত্র বৈদ্যুতিক সুবিধা, তারাও মূল্যবৃদ্ধির আওতার বাইরে থাকেনি। উন্নত কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণায় মৌলিক সেবার ক্ষেত্রে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া হয়। অথচ আমাদের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে ঠিক উল্টো চিত্র—খাতের আর্থিক সংকট মোকাবিলার দায়ভারও শেষ পর্যন্ত বহন করতে হচ্ছে সবচেয়ে কম সামর্থ্যবান মানুষকে।
সরকারের যুক্তি, ভর্তুকি কমানো ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু এই ভর্তুকির পাহাড় সৃষ্টি হলো কীভাবে? বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাস বলছে, বছরের পর বছর অপরিকল্পিত বিনিয়োগ, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি উৎপাদন সক্ষমতা সৃষ্টি, উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি এবং ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিতর্কিত ব্যবস্থার কারণে রাষ্ট্রীয় ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন না করেও অর্থ পেয়েছে, অথচ সেই ব্যয়ের দায় জনগণের ওপরই বর্তেছে। প্রশ্ন হলো, এসব সিদ্ধান্তের জন্য যারা দায়ী, তাদের জবাবদিহি কোথায়? কেন বারবার একই সমাধান—দাম বৃদ্ধি?
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত পর্যালোচনা কমিটি জানিয়েছিল, বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন চুক্তি পুনর্বিবেচনা ও ব্যয়সংকোচনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে। যদি সত্যিই হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় রোধের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সেই সংস্কার কার্যকর হওয়ার আগেই কেন জনগণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপানো হলো? জনগণের কাছ থেকে আরও অর্থ আদায় করা কি সংস্কারের বিকল্প হতে পারে? এই সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়াও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। গণশুনানির অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন দর ঘোষণা করা হয়েছে, অথচ এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা হয়নি বলে কমিশন নিজেই স্বীকার করেছে। অর্থাৎ কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বাড়বে, মূল্যস্ফীতিতে এর কী প্রভাব পড়বে, কৃষি ও শিল্প খাতে এর অভিঘাত কতটা হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর না জেনেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় এমন প্রক্রিয়া উদ্বেগজনক।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি কখনোই শুধু বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র অর্থনীতিতে। কৃষকের সেচ খরচ বাড়ে, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার মাধ্যমে এর চূড়ান্ত মূল্য পরিশোধ করে সাধারণ ভোক্তা। ফলে বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল একটি খাতের সিদ্ধান্ত নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টির আশঙ্কাও তৈরি করছে। রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক নীতি হলো— জনগণের কাছ থেকে ত্যাগ স্বীকারের আহ্বান জানানোর আগে রাষ্ট্র নিজে অপচয় ও অদক্ষতা কমানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের ক্ষেত্রে বারবার উল্টো চিত্র দেখা গেছে।
কাঠামোগত সংস্কার, অস্বচ্ছ চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন, দায় নিরূপণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার কঠিন পথ এড়িয়ে সবচেয়ে সহজ পথটি বেছে নেওয়া হয়েছে—দাম বাড়ানো। এতে হয়তো সাময়িকভাবে হিসাবের খাতা কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ হবে, কিন্তু সমস্যার মূল কারণ অমীমাংসিতই থেকে যাবে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত তাই কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্নও। যে খাতের অদক্ষতা ও ভুল সিদ্ধান্তের দায় জনগণ সৃষ্টি করেনি, সেই খাতের ঘাটতি পূরণে জনগণকেই বারবার মূল্য দিতে হবে কেন? সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল সংস্কার, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা; কিন্তু তারা পেল আরও একটি মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা।
সংকটের সময়ে রাষ্ট্রের প্রকৃত পরীক্ষা হয় সে কাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তার ওপর। বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি সেই পরীক্ষায় নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—সরকার কি বিদ্যুৎ খাতের অসংগতি দূর করার পথ বেছে নেবে, নাকি ভবিষ্যতেও প্রতিটি সংকটের সহজ সমাধান হিসেবে জনগণের পকেটেই হাত দেবে?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









