আমাদের চারপাশে অসংখ্য মানুষের ভীড়ে মহৎ ও নান্দনিক চিন্তার মানুষ খুব বেশি নেই। যাঁরা নিজের কথা না-ভেবে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করেন তাঁদের সংখ্যা একেবারেই কম। হাতেগোনা যে কয়েকজন মানুষ শিল্প-সাহিত্য এবং সেচ্ছাসেবী সংগঠন নিয়ে কাজ করেন সমাজ ও রাষ্ট্র সবসময় তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়। তারপরেও ওই সকল মহৎ মানুষদের মহতী উদ্যোগ থেমে যায় না, বরং নিজেদের চেষ্টা ও শ্রমে সদা ক্রিয়াশীল থাকে। এমনই একজন মহৎ ও নান্দনিক চিন্তার মানুষ ছিলেন ফকির খালেক। তিনি ছিলেন একজন বাম রাজনীতির একনিষ্ঠ কর্মী । ছিলেন ছড়াকার, নিবেদিত প্রাণ সংগঠক এবং মানুসিকভাবে ছিলেন চির তরুণ। কর্মচঞ্চল অনুসরণীয় ফকির খালেক ১৯৪৭ সালের ২২শে নভেম্বর পাবনা জেলার ভাঙ্গুড়া উপজেলার পাথরঘাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম আবীর উদ্দিন, মাতা ছালেহা খাতুন। ফকির খালেক ২০২৫ সালের ১লা জুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজশাহী মেডিক্যাল হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
ফকির খালেকের শৈশবকালের বেশিরভাগ সময় কেটেছে বন্দরনগরী চট্রগ্রামে। বড়ো ভাইয়ের চাকরির সুবাধে সেখানে থাকতেন তিনি। শিক্ষানুরাগী ভাইয়ের ইচ্ছানুযায়ী ভর্তি হন স্থানীয় স্কুলে। ক্লাসের মনোযোগী ছাত্র ফকির খালেকের মনোযোগ আকর্ষণ করেন তারই শ্রেণি শিক্ষক জনাব নজির আহমদ। তিনি ছিলেন বাম রাজনীতির আদর্শ লালন করা একজন উদ্দোমী তরুণ শিক্ষক। নজির স্যারের মনের চিন্তা-চেতনা নাড়া দেয় ফকির খালেকের মনে। মেহনতি মানুষের স্বপ্ন বাস্তবে রূপদানের সংগ্রাম শুরু করেন নজির স্যারের হাত ধরেই। যদিও পরবর্তীতে রাজনীতির সাথে সক্রিয় থাকতে পারেননি কিন্তু আজীবন সেই আদর্শ থেকেও বিচ্যুত হননি।
সেইসাথে অবস্থানগত দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আমৃত্যু প্রিয় নজির স্যারের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন এবং নিজেদের রাজনৈতিক স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বিষয়াদি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করতেন। এ থেকে বোঝা যেত, ফকির খালেক জীবনের শেষ পর্যন্ত খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের মুক্তির কথাই ভেবেছেন। ফকির খালেক পেশাগত জীবনে প্রথমে স্থির হতে পারেননি। ভবঘুরে জীবন কাটিয়েছেন দীর্ঘদিন। তারপর স্ত্রীর চাকরির সুবাদে রাজশাহী বসবাস এবং সেখানে গাভি পালন শুরু করেন এবং পরে নিজ জন্মভূমিতে কৃষিকাজ, ফলজ বাগান ও গৃহপালিত পাখি পালন করে সময় অতিবাহিত করেছেন। সেইসাথে তিনি যে কাজটি করেছেন তা হলো- এ অঞ্চলের কিছু মানুষকে নিয়ে শিল্প-সাহিত্যচর্চায় গতি সঞ্চার করেছেন অপ্রতিরোদ্ধ গতিতে। এ কাজে তিনি ছিলেন আত্মনিবেদিত একজন মানুষ। প্রথমে শিশুদের আবৃত্তি শিখানোর কাজ দিয়ে শুরু করেন তার যাত্রাকাল। 'কিশলয়' নামক সংগঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে কবিতা আবৃত্তির আয়োজন এবং অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বই পুরস্কার প্রদান করতেন।
তারপর ২০১৭ সালে ' আদর্শ সাহিত্য পরিষদ' নামক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে স্থানীয় নবীন-প্রবীণ লেখকদের লেখালেখিতে উৎসাহ যোগাতে কয়েকটি কাব্য সংকলন প্রকাশ করেন। এগুলোর মধ্যে প্রথম প্রকাশনা ছিল- 'পদক্ষেপ'। এই সংকলন প্রকাশ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, "জীবন বাঁচাতে যেমন খাদ্য ও পানীয়ের প্রয়োজন, জীবন সাজাতে তেমনি ফুল ও কবিতার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। বর্তমানে ঘুষ, দুর্নীতি, গুম-খুন, রাহাজানি ও সর্বগ্রাসী মাদকাসক্তি সমাজ-জীবনকে যেভাবে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে তার বিপরীতে আত্মসচেতনতা সৃষ্টি করতে ফুল ও কবিতার বিকল্প নাই। ফুল শোভা ও সুবাস ছড়িয়ে বাঙালির দ্বারে দ্বারে পৌছে দেয় বসন্তের আমেজ আর কবিতা হৃদয় চিত্তে সৃষ্টি করে মহাসাগরের মহাকলতানের সুর। তাই অন্ধকারাচ্ছন্ন অপসংস্কৃতির পথ পরিহার করে আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যত গড়তে আমাদের প্রতিদিনের স্বপ্ন হোক ফুলের চাষ আর কবিতার সাথে বাস। এই প্রত্যাশা নিয়ে প্রকাশিত হলো এবারের পদক্ষেপ।" এ থেকেই তার সমাজ সচেতনতা ও কবিতার প্রতি অনুরক্ততা অনুধাবন করা যায়। কবিতার সংকলন প্রকাশের পর আরও সমৃদ্ধ চিন্তা নিয়ে ফকির খালেক লিটলম্যাগ 'ভাঙন'র প্রকাশনা শুরু করেন।
এই সময় তাঁর সাথে যুক্ত হয় আরেক স্বপ্নবাজ ও মেধাবী মানুষ নাছির উদ্দিন আহমাদ। তিনি টুকটাক প্রবন্ধ লিখতেন। বিস্তর পড়াশোনা ছিল তাঁর। নিজস্ব প্রেস ছিল। ছিল সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করার উদার মন। নাছির উদ্দিনের সহযোগিতায় ফকির খালেক নিজের সম্পাদনায় ভাঙণ'র দুটি অনবদ্য সংখ্যা (ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ও ফেরুয়ারি ২০২০) আমাদের হাতে তুলে দেন। যা সাহিত্য সুধীজনের কাছে সমাদৃত হয়। তারপর করোনায় পৃথিবীতে স্থবিরতা নেমে এলেও ফকির খালেক থেমে থাকেননি। এসময় কথাসাহিত্যিক আবদুল মান্নান সরকার, নাছির উদ্দিন আহমাদ ও নুরুল ইসলাম বাবুলকে নিয়ে শুরু করেন এক বিশেষ যাত্রা। মানবমুক্তির এক মহাভাবনা নিয়ে শুরু করেন "মানবচর্চা কেন্দ্র"। যার পরিধি ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা জয়গায়। এই কেন্দ্র'র মুখপত্র হিসেবে প্রকাশ হতে শুরু করে ত্রৈমাসিক পাথার। তিনটি নান্দনিক সংখ্যা নিয়মিত প্রকাশের পর প্রকাশক নাছির উদ্দিন আহমাদ গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার দিকে চলে যায়। তবু হার মানেনি ফকির খালেক। বয়সী মানুষ হলেও তিনি ছিলেন সবার থেকে কর্মঠ, উদ্যোগী। সবসময় তারুণ্যের কর্মস্পৃহা ছিল তার চলাফেরায়। তিনি পাশের জনকে তাড়িয়ে বেড়াতেন, 'চলো করতে হবে, পারব না কেন, কাজে লেগে পড়ো'।
এরকম উৎসাহ ব্যঞ্জক তাড়া দিতেন সব সময়। তিনি শুধু অন্যদের উৎসাহ দেননি, নিজেও লিখেছেন অসংখ্য ছড়া ও কবিতা। প্রকাশিত হয়েছে তাঁর তিনটি ছড়াগ্রন্থ। সেগুলো হলো - 'ঘুমের রানী মাসি পিসি' (২০১৯), 'ফোকলা বুড়ি' (২০২০) এবং 'ভোরের পাখি' (২০২২)। এতোমধ্যে পাবনা, ফরিদপুর, চাটমোহর, ঈশ্বরদী, মুলাডুলিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজের অবস্থান জানান দেন। উল্লেখ্য যে, এসব অনুষ্ঠানে তিনি একা যোগ দেননি, সাথে নিয়ে যেতেন আশেপাশের লেখকদেরও। এভাবে সবার মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করতেন ফকির খালেক। পার্শ্ববতী ফরিদপুরের "প্রত্যয় সাহিত্য পরিষদ" বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে সম্মানিত অতিথি, প্রধান অতিথি করে আমন্ত্রণ করেছেন। এছাড়াও স্বরচিত কবিতা পাঠ করে পেয়েছেন "প্রত্যয় সাহিত্য পরিষদ" কর্তৃক 'শ্রেষ্ঠ কবি পুরস্কার'। ছড়াকার ফকির খালেক বেঁচে থাকাকালীন তাঁর একটি ছড়ার বই সম্পর্কে বলতে গিয়ে এ সময়ের অন্যতম কথাসাহিত্যিক আবদুল মান্নান সরকার লিখেছেন, "ফকির খালেক রাজনীতির একজন অক্লান্ত সৈনিক। সারাজীবন আদর্শের রাজনীতি করেছেন। সমাজ বলদের স্বপ্ন দেখেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দেশের অনেকেই রাজনীতিতে ডিগবাজী খেয়েছেন, কিন্তু ফকির খালেক খাননি। তিনি আদর্শ থেকে এক চুল সরে দাঁড়াননি। ফকির খালেক শেকড় সন্ধানী মানুষ, যে কারণে এই মানুষটিকে ভালো না-বেসে পারা যায় না। তিনি যে শুধু রাজনীতিই করেন তা নয়, তিনি একজন সফল সংগঠক, শিল্প- সাহিত্যের সমঝদার, পৃষ্ঠপোষকও। তিনি উদ্যোগী মানুষ, বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত আছেন।
নানা সময়ে সাহিত্য পত্রিকা, সাময়িকী এসবও সম্পাদনা করেছেন। ... ফকির খালেক শিশুদের ভালোবাসেন, শিশুদের নিয়ে ভাবেন। তাই তিনি শিশু মানস গঠনে পরিচর্যার ভাবনা থেকেই ছড়া-কবিতা লিখে থাকেন। ছড়া লেখায় তিনি বেশ সিদ্ধহস্ত।... সে সব যথেষ্ট শিল্পোত্তীর্ণ ও রসোত্তীর্ণ , সুখপাঠ্য।... ফকির খালেকের ছড়ায় বিষয় বৈচিত্র্য আছে, তেমনি তা বেশ আনন্দদায়কও। তাঁর ছড়ায় ছন্দ, অন্ত্যমিল এসবও বেশ কুশলী হাতের রচনা ...।" আবদুল মান্নান সরকারের এই মূল্যায়ন অসাধারণ এবং যথাযথ। আমার জানামতে, ফকির খালেক আরও একটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেছিলেন। সেটি প্রকাশনার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু তা সমাপ্ত হয়নি। তাঁর মৃত্যুর মাত্র তিনমাস আগে প্রকাশক নাছির উদ্দিন আহমাদ অকালে মৃত্যুবরণ করেন। নাছির আহমাদ ছিলেন তার একান্ত ঘনিষ্টজন।
এই শোক ফকির খালেককে অনেকটা দুর্বল করে দিয়েছিল । তারপরও নতুন উদ্দোমে প্রতিষ্ঠা করেন 'নাছির কল্যান পরিষদ'। তবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে স্নেহের নাছিরের দিকেই যাত্রা করলেন তিনি। আমরা হারালাম একজন নিবেদিতপ্রাণ সাহিত্যকর্মী । যা আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। পরিশেষে বলব, আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে অতি কাছে থেকে দেখেছি। ছড়াকার, সংগঠক, রাজনৈতিক কর্মী সবকিছু ছাপিয়ে তিনি ছিলেন একজন পরিচ্ছন্ন মনের মানুষ। মানুষের প্রতি অগাধ বিশ্বাস, মানুষকে আপন করে নেওয়ার অসাধারণ এক মহৎ গুণ ছিল তার ভেতরে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তার দৃঢ় আত্মবিশ্বাস আর কাজের প্রতি যে দুর্নিবার আকর্ষণ ছিল, তা সত্যিকারেই আমাদের জন্য একটি অনুসরণীয় ব্যাপার।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক, কবি ও কলামিষ্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









