বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন এবং সীমান্তবর্তী শাহপরীর দ্বীপ আজ জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক জোয়ার, ঘনঘন ঘূর্ণিঝড়, নদী ও সাগরভাঙন এবং লবণাক্ততার বিস্তার এই অঞ্চলের মানুষের জীবন, জীবিকা ও বসতি ক্রমাগত বিপন্ন করে তুলছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি শুধু একটি পরিবেশগত সংকট নয়; এটি মানবিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সংকটেরও প্রতিচ্ছবি।
গত এক দশকে হাজার হাজার মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও জীবিকার উৎস হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ভাঙনের কারণে সেন্টমার্টিনের ভূমি সংকুচিত হচ্ছে, আর শাহপরীর দ্বীপের বহু পরিবার বারবার বসতি হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব মানুষের অনেকেই এখনও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন, কারণ তাদের যাওয়ার মতো নিরাপদ কোনো বিকল্প নেই।
জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি ভয়াবহ প্রভাব দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির সংকটে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরাপদ পানির অভাব দিন দিন তীব্র হচ্ছে। এর ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। পানিবাহিত রোগ, আর্সেনিকজনিত জটিলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যার আশঙ্কা উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙনের আশঙ্কা এবং জলবায়ু ঝুঁকির বিষয়ে সতর্কবার্তা উচ্চারিত হলেও কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপের ঘাটতি রয়ে গেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পরিবেশবিদ এবং সাধারণ মানুষের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, এখন আর শুধু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করার সময় নেই; প্রয়োজন বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।
সরকারের উচিত দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর সঠিক তালিকা প্রস্তুত করে পরিকল্পিত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। নিরাপদ আবাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়বে। পাশাপাশি উপকূল রক্ষায় বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত বাঁধ, ব্লক স্থাপন, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী ও ম্যানগ্রোভ বন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচি শক্তিশালী করা, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং স্থানীয় জনগণকে দুর্যোগ প্রস্তুতিতে সম্পৃক্ত করাও জরুরি। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শুধু অবকাঠামোগত ব্যবস্থা নয়, জনগণের সক্ষমতা বৃদ্ধি সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেন্টমার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপের সংকট আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাব্য বিপদ নয়, এটি আজকের বাস্তবতা। তাই এই অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় বাংলাদেশের এই অনন্য ভূখণ্ড এবং এর অধিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









