ঢাকার সড়কে প্রতিদিন যে অচলাবস্থা তৈরি হয়, তার ক্ষতি শুধু সময়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মূল্য দিতে হচ্ছে জাতীয় অর্থনীতিকে। কর্মঘণ্টার অপচয়, জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যয়, উৎপাদনশীলতার হ্রাস এবং পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ—সব মিলিয়ে যানজট আজ দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক। এই সংকট থেকে উত্তরণের সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই সমাধান হিসেবে মেট্রোরেলকে দেখা হয়। তাই এই প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি দিনের অগ্রগতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজধানীর ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার এই প্রকল্পই এখন প্রশাসনিক বিলম্ব ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ঢাকার মেট্রোরেল সম্প্রসারণ প্রকল্প (এমআরটি) বাস্তবায়নে বিলম্ব অব্যাহত থাকলে আরও আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্প থেকে সরে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাপান। প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে আশ্বস্ত করতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি। সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি এ আহ্বান জানান। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পটির দর-কষাকষির অধিকাংশ আলোচনা এখনো ২০১৯ সালের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) ব্যয় কাঠামোর ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। অথচ গত ছয় বছরে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সঙ্গে চলতি বছরে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বৈশ্বিক বাজারে নতুন মূল্যচাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে দরদাতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বাড়ছে।
জাপান সরকারের এই সতর্কবার্তা কোনো সাধারণ কূটনৈতিক মন্তব্য নয়; বরং এটি বাংলাদেশের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত। প্রকল্পটির প্রধান অর্থায়নকারী ও উন্নয়ন অংশীদার যখন সরাসরি বলছে যে ক্রয়প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ না হলে আরও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সরে যেতে পারে, তখন বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করা জরুরি। ইতোমধ্যে একটি বড় জাপানি প্রতিষ্ঠান দরপ্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। এরপরও যদি সংশ্লিষ্ট মহলে প্রয়োজনীয় তৎপরতা দেখা না যায়, তবে তা হবে অত্যন্ত হতাশাজনক।
প্রশ্ন হলো, এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো? প্রায় দেড় বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ক্রয় ও চুক্তি প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির ছিল। এই সময়ে বিশ্ববাজারে নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে, সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবর্তে এখনো পুরোনো ব্যয় কাঠামোকে ভিত্তি করে আলোচনা চলছে। নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবতার এই ফারাক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অশনিসংকেত। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিলম্বের মূল্য শেষ পর্যন্ত জনগণকেই পরিশোধ করতে হবে।
যদি বর্তমান দরপ্রক্রিয়া ব্যর্থ হয় এবং নতুন করে দরপত্র আহ্বান করতে হয়, তাহলে প্রকল্প ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যয় শতভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। অর্থাৎ আজকের সিদ্ধান্তহীনতা আগামী দিনে হাজার হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত বোঝা হয়ে করদাতাদের কাঁধে চাপবে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক ঠিকাদার ও বিনিয়োগকারীরা শুধু একটি প্রকল্পের আর্থিক লাভ-ক্ষতিই বিবেচনা করেন না; তারা একটি দেশের প্রশাসনিক সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সংস্কৃতিকেও মূল্যায়ন করেন। মেট্রোরেল প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা যদি বিদেশি অংশীদারদের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করে, তবে এর নেতিবাচক প্রভাব ভবিষ্যতের অন্যান্য বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পেও পড়তে পারে।
সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার মূল্য সব সময়ই বেশি। মেট্রোরেল প্রকল্পের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হওয়ার সুযোগ নেই। আজ যে বিলম্বকে সামান্য প্রশাসনিক জটিলতা বলে মনে হচ্ছে, তা আগামী দিনে কয়েক হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়, দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তি এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। রাজধানীবাসী বহুদিন ধরেই একটি আধুনিক, গতিশীল ও কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থার অপেক্ষায় আছে। সেই প্রত্যাশাকে আর দীর্ঘায়িত করার সুযোগ নেই।
জাতীয় অর্থনীতি, নগর উন্নয়ন এবং জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে মেট্রোরেল সম্প্রসারণ প্রকল্পের সব অনিশ্চয়তা দ্রুত দূর করতে হবে। ফাইলবন্দি প্রক্রিয়া, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সিদ্ধান্তহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। মেট্রোরেল প্রকল্পে বিলম্বের অর্থ শুধু একটি নির্মাণকাজ পিছিয়ে যাওয়া নয়; এর অর্থ রাজধানীর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক জীবনের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নও পিছিয়ে যাওয়া। তাই নতুন করে অনিশ্চয়তা সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই। জাতীয় স্বার্থে প্রকল্পটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









