** চড়ছে বিএনপি-জামায়াত উত্তেজনার পারদ
** ভোটের লড়াইয়ে স্থিতিশীলতা ফেরা নিয়ে শঙ্কা
এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের লক্ষ্য পুরোপুরি আলাদা। বিএনপি যেখানে পূর্ণ শক্তি দিয়ে সরকার গঠন করতে মরিয়া, জামায়াত সেখানে বিজয়ের পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের নৈতিক অভিভাবক হওয়ার পথে হাঁটছে। জামায়াত মনে করে, কোনো কারণে সরকারে যেতে না পারলেও গণভোটের মাধ্যমে পাস হওয়া ‘সংস্কারগুলো’ যখন পরবর্তী সরকারের জন্য একটি অদৃশ্য শিকল হবে, তখন তারা রাজপথে থেকে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট কেবল একটি সরকার নির্বাচনের লড়াই নয়, এটি বাংলাদেশের আগামীর গতিপথ নির্ধারণের লড়াই। বিএনপি যখন মসনদ দখলের মাধ্যমে এক যুগের রাজনৈতিক তৃষ্ণা মেটাতে চাইছে, জামায়াত তখন গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ’ডিএনএ’ বদলে দিয়ে নিজেদের অবস্থানকে অপরিহার্য করে তুলছে। জামায়াতের এই ’অদৃশ্য শিকল’ যদি সফল হয়, তবে বিএনপি সরকার গঠন করলেও তাদের প্রতিটি কদমে ‘বিপ্লবের পাহারাদার’ দাবি করা জামায়াত জোটের মুখোমুখি হতে হবে। ক্ষমতার এই দ্বৈত লড়াই কি স্থিতিশীলতা আনবে, নাকি অন্যকিছু- তার উত্তর খুজঁতে বিভিন্ন বিশ্লেষকের মুখোমুখি হয়েছে দৈনিক এদিন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ এই পরিস্থিতিকে দেখছেন অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টিতে। দৈনিক এদিন-এর সাথে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ক্ষমতার চাবিকাঠি থাকবে বিএনপির হাতে, কিন্তু সেই চাবি ঘোরানোর কলকব্জা নিজেদের হাতে জামায়াত রাখতে চাইলেও রাষ্ট্র চলবে সংবিধান সম্মত। তাঁর মতে, বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে যদি জামায়াত জোটের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোতে হাত না দেয় বা পিছিয়ে যায়, তবে জামায়াত জোট সেটিকে ‘বিপ্লবের সাথে বেইমানি’ আখ্যা দিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত করার মোক্ষম সুযোগ নিতে পারে।
আগামীর বাংলাদেশ এক নতুন ভারসাম্যপূর্ণ দ্বৈত শাসনের দিকে যাচ্ছে কিনা? দৈনিক এদিনের এমন প্রশ্নে অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ দ্বৈত শাসনের ইঙ্গিত নাকচ করেন, তিনি বলেন, কাগজে-কলমে বা আইনিভাবে দ্বৈত শাসনের কোনো সুযোগ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গেবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, বিএনপি-জামায়াতের বিপরীতমুখী লক্ষ্য একই সমান্তরালে চললে ভোটের পরবর্তী বাংলাদেশে এক কৌশলগত সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। যেখানে একদিকে থাকবে নির্বাচিত সরকারের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, আর অন্যদিকে থাকবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের দোহাই দিয়ে জামায়াত জোটের আদর্শিক পাহারাদারি যা আগামীর রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজপথের যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এ বিষয়ে দৈনিক এদিনের সাথে কথা বলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক । তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ দলিল হলো সংবিধান। বর্তমান সংবিধানকে বাতিল বা স্থগিত করার আইনি ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। শাহদীন মালিক বলেন, সংবিধান বলবৎ থাকা অবস্থায় গণভোটের মাধ্যমে ভিন্ন কোনো কাঠামো চাপিয়ে দেওয়া আইনি সাংঘর্ষিক। নির্বাচিত সরকার যদি এই রায় উপেক্ষা করতে চায়,জামায়াত সেটিকে গণরায়ের অবমাননা হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে আইনিভাবে সরকারকে চাপের মুখে রাখতে চাইলেও সাংবিধানিক বাস্তবতায় তা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গেবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, যদি বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে এবং জামায়াত জোট ‘হ্যাঁ’ ভোটকে তাদের রাজনৈতিক রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করে, তবে একটি ‘কৌশলগত সংঘাত’ অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
আইন বিশ্লেষকরা মনে করেন, ড. শাহদীন মালিক ঠিক যে বিষয়টি বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো, আইনি সীমাবদ্ধতা; অর্থাৎ সংবিধান যতক্ষণ পর্যন্ত সংসদের মাধ্যমে সংশোধন না হচ্ছে, ততক্ষণ গণভোটের কোনো প্রস্তাবই আইনিভাবে কার্যকর নয়। দ্বিতীয়ত, অকার্যকর চাপ; জামায়াত জোট এই রায়কে গণরায়ের অবমাননা বলে রাজপথে যতোই চাপ সৃষ্টি করুক না কেন, আইনিভাবে আদালত বা প্রশাসন সেই রায় বাস্তবায়ন করতে পারবে না।
কারণ, ‘জনগণের ইচ্ছা’ বা ‘পাবলিক ডিমান্ড’ কোনো অবস্থাতেই ‘সংবিধান’এর ওপরে স্থান পেতে পারে না। আর তৃতীয়ত, সংঘাতের উৎস; এই উদাহরণটি স্পষ্ট করে দেয় যে, জামায়াত চাইবে ‘জনগণের রায়’ বাস্তবায়ন করতে, আর বিএনপি সরকার দাঁড়িয়ে থাকবে ‘আইনের শাসনের’ দোহাই দিয়ে। ড. মালিকের মতে, এই সাংবিধানিক বাস্তবতার কারণেই জামায়াতের সেই চাপ শেষ পর্যন্ত আইনিভাবে সফল হবে না।
তবে গণভোটের হ্যাঁ ফল বাস্তবায়নে বেশ আশাবাদী জামায়াতে ইসলামী। দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মনে করেন, যদি গণভোটে বর্তমান সংস্কারগুলো (যেমন বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ সংস্কার) জনগণের সরাসরি রায় পায়, তবে নির্বাচিত সরকার চাইলেও সেগুলোকে উল্টে দিতে পারবে না।
জামায়াত এ জন্য রায়ের দোহাই দিয়ে সংসদ ও রাজপথে বিএনপি সরকারকে এক ধরণের চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স এর মধ্যে রাখতে চায়। জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন যে, জুলাই বিপ্লবের স্বীকৃতি ছাড়া ২০২৬ সালের নির্বাচনের কোনো ভিত্তি নেই । তার মতে, গণভোটই হলো সেই ‘আইনি ভিত্তি’ যা বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে সুরক্ষিত করবে।
তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ময়মনসিংহ জনসভার বক্তব্য নতুন এক সংঘাতের ইঙ্গিত দিয়েছে। তিনি নাম না করে জামায়াতকে ইঙ্গিত করে সতর্ক করেছেন যে, স্বৈরাচারী ভাষা ব্যবহার করে বিএনপিকে টার্গেট করা হচ্ছে । এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, ভোটের দিন এক হলেও, প্রচারণার মাঠে এই দুই মিত্র দল এখন একে অপরের ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী। এই অপ্রত্যাশিত ফাটল আগামীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক হাওয়া কোন দিকে বইয়ে দেবে, সহযোগিতার, নাকি তীব্র সংঘাতের- তা নিয়েই রাজনৈতিক মহলে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









