সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

একটি নিথর প্রাণে লাখো পুলিশের কষ্টগাথা

প্রকাশিত: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১০ পিএম

আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১৩ পিএম

একটি নিথর প্রাণে লাখো পুলিশের কষ্টগাথা

কনস্টেবল শফিকুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

রাত তখন ৩টা ২৫ মিনিট। চারদিকে নিঝুম নিস্তব্ধতা। ২৮ শে জানুয়ারী ২০২৬ তারিখে যখন পুরো শহর ঘুমে বিভোর, তখন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির এক কোণে বসে জীবনের শেষ হিসাব মেলাচ্ছিলেন কনস্টেবল শফিকুল ইসলাম (৪২)। কাঁপাকাঁপা হাতে বড় মেয়ের ফোনে পাঠালেন একটি খুদে বার্তা, যাতে মিশে ছিল এক বুক হাহাকার আর ব্যর্থতার গ্লানি। লিখেছিলেন, ‘মা, আমি তোমাদের প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছি, আমাকে ক্ষমা করে দিও। তোমার ছোট ভাই-বোনদের দেখে রেখো।’ সেই বার্তার পর মেয়ে বারবার ফোন দিলেও ওপাশ থেকে আর কোনো সাড়া মেলেনি। ভোরের আলো ফুটতেই সহকর্মীরা ফাঁড়ির ওয়াশরুমে খুঁজে পান শফিকুলের নিথর দেহ। ২০০৩ সালে যে মানুষটি দেশ সেবার ব্রত নিয়ে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন, দীর্ঘ ২৩ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন এক টুকরো রশির শেষ প্রান্তে।

পুলিশ সুত্র বলছে, চাঁদপুরের মতলব উত্তরের মৌটুপী গ্রামের মান্নান মল্লিকের ছেলে শফিকুল ছিলেন তিন সন্তানের জনক। বাইরে থেকে কঠোর ডিউটির পোশাক পরা মানুষটির ভেতরে যে দীর্ঘদিনের মানসিক অবসাদ ও অনিদ্রার এক অন্ধকার জগৎ বাসা বেঁধেছিল, তা হয়তো অজানাই থেকে যেত। স্বজনরা জানান, শফিকুল দীর্ঘদিন ধরে মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন, যার জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্নও হতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না।

পেশাগত দায়িত্বের কঠিন লড়াইয়ে জয়ী হলেও মনের ভেতরের লড়াইয়ে হেরে গেলেন শফিকুল। তার মৃত্যু রেখে গেছে তিনটি এতিম সন্তান আর এক অপূরণীয় শূন্যতা। যে মানুষটি মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতেন, বিষণ্ণতার নীল দংশনে নিজের জীবনটিই তিনি আর নিরাপদ রাখতে পারলেন না। এই ঘটনাটি শুধু তার সহকর্মী ও পরিবারকেই নয়, পুরো সমাজকে গভীরভাবে শোকাহত করেছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও রক্তমাংসের মানুষ, যাদেরও মানসিক চাপ ও ব্যক্তিগত সমস্যা থাকতে পারে। শফিকুল ইসলামের আত্মহত্যার পেছনে যে কারণগুলো উঠে এসেছে, তা আমাদের সমাজের সংবেদনশীল দিকগুলো ভাবিয়ে তোলে। এটি শুধু শফিকুলের শোকগাথা নয়, যেন একটি নিথর দেহে লাখো পুলিশের জীবনযুদ্ধের কষ্টগল্প।

কাজের চাপ ও মানসিক অবসাদ
রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের জীবন আপাতদৃষ্টিতে কঠোর ও যান্ত্রিক মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক চরম মানবিক বিপর্যয়। কনস্টেবল শফিকুল ইসলামের করুণ মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, দিনের পর দিন বিরামহীন কর্মঘণ্টা, অনিশ্চিত ডিউটি রোস্টার এবং ছুটির তীব্র সংকট একজন মানুষকে কতটা প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। কেবল অপরাধ দমন নয়, বরং প্রতিকূল পরিবেশে জনসাধারণের সাথে সরাসরি সংযোগের যে মানসিক ধকল, তা দীর্ঘমেয়াদে অনিদ্রা ও স্নায়বিক বৈকল্যের মতো জটিল শারীরিক ও মানসিক সমস্যার জন্ম দেয়। যখন পেশাগত এই বার্নআউট বা চরম ক্লান্তি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তখন শফিকুলদের মতো সদস্যরা নিরুপায় হয়ে আত্মহননের মতো চরম পথ বেছে নেন। এই সংকট কেবল একটি ব্যক্তিগত বিচ্যুতি নয়, বরং এটি আমাদের প্রচলিত পুলিশিং ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। তাই পুলিশ বাহিনীর কর্মদক্ষতা ধরে রাখতে হলে কেবল কৌশলগত উন্নয়ন নয়, বরং পুলিশ সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর  অসহনীয় চাপের অবসান ঘটানো এখন সময়ের দাবি।

পারিবারিক দায়িত্ব ও আর্থিক টানাপোড়েন
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি প্রায়ই গুটি কয়েক সদস্যের অনৈতিক কর্মকাণ্ড বা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয় এটা সত্যি। তবে এই সংকটের গভীরে তাকালে এক রূঢ় আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা উন্মোচিত হয়। বাহিনীর সিংহভাগ মাঠপর্যায়ের সদস্য, বিশেষ করে কনস্টেবলরা, যে বেতন কাঠামোতে জীবন ধারণ করেন, তা বর্তমান আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্যের বাজারে একটি মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ন্যূনতম চাহিদার চেয়েও কম। যখন একজন পুলিশ সদস্যকে অপর্যাপ্ত বেতন নিয়ে মাস শেষে পরিবারের অন্ন, বস্ত্র ও সন্তানের শিক্ষার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয়, তখন তাঁর পেশাদারিত্ব আর ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার মধ্যে এক প্রবল দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। ফলে অনেককে আর্থিক সংকটের সাথে লড়াই করতে হয়, যা তাদের মানসিক চাপ বাড়ায় এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনে অক্ষমতার অনুভূতি তৈরি করে। একজন পিতা বা মাতা হিসেবে সন্তানদের সকল চাহিদা পূরণে অক্ষমতা এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে না পারার যন্ত্রণা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। এই আর্থিক টানাপোড়েন এবং পারিবারিক দায়িত্বের ভার তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্য ও সহায়তা কেন চাই
রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে পুলিশ সদস্যরা প্রতিনিয়ত এক প্রতিকূল ও উচ্চ-চাপযুক্ত পরিবেশে দায়িত্ব পালন করেন। অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংঘাতময় পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে গিয়ে তাদের যে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়, তার আড়ালে প্রায়ই চাপা পড়ে যায় তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি। অবিরাম কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং পারিবারিক সান্নিধ্য থেকে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা তাদের মধ্যে এক গভীর মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ ও অনিদ্রার জন্ম দেয়। এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ কেবল তাদের পেশাদারিত্বকেই ক্ষুণ্ণ করে না, বরং ব্যক্তিগত জীবনেও বিপর্যয় ডেকে আনে। যার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে কনস্টেবল শফিকুল ইসলামের মতো আত্মহননের মধ্য দিয়ে। সুতরাং, পুলিশ বাহিনীকে কেবল একটি যান্ত্রিক সংস্থায় সীমাবদ্ধ না রেখে, তাদের মানবিক সংকটগুলো উপলব্ধি করা এবং একটি প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। পেশাদার কাউন্সিলিং এবং মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা কেবল তাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন নয়, বরং একটি কার্যকর ও সংবেদনশীল পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার পূর্বশর্ত। 

সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার পুলিশ বাহিনীর মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার ওপর। তবে দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, ছুটির অনিশ্চয়তা এবং অপর্যাপ্ত আর্থিক প্রণোদনা পুলিশ সদস্যদের পেশাদারিত্বকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। শৃঙ্খলার কঠোর ঘেরাটোপে আটকে থাকা এই মানুষগুলো যখন ক্রমাগত মানসিক অবসাদ ও আর্থিক টানাপোড়েনের শিকার হন, তখন তা কেবল তাদের ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সেবার মানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। কনস্টেবল শফিকুল ইসলামের মতো মর্মান্তিক আত্মহননের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, পুলিশ সদস্যদের জন্য কেবল উন্নত অস্ত্র বা প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়; বরং তাদের জন্য একটি মানবিক কর্মপরিবেশ, সময়োপযোগী বেতন কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে। পেশাদার কাউন্সিলিং এবং সহকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সমর্থনের সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে যদি এই মানসিক দেয়াল ভাঙা না যায়, তবে কেবল কঠোর আইন দিয়ে একটি সংবেদনশীল ও দক্ষ পুলিশ বাহিনী গঠন করা অসম্ভব। তাই পুলিশের ‘ওয়েলবিয়িং’ বা সামগ্রিক কল্যাণকে এখন কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।

শেষ কথা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর উর্দির আড়ালে যে এক একজন রক্তমাংসের মানুষ বাস করেন, যাদের হাসি-কান্না, অভাব-অনটন আর গভীর মানসিক সংকট রয়েছে, কনস্টেবল শফিকুল ইসলামের মতো হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলো সমাজকে সেই রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আমরা প্রায়শই পুলিশকে কেবল রাষ্ট্রের একটি শক্তিপ্রয়োগকারী যন্ত্র হিসেবে দেখি, কিন্তু ভুলে যাই যে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পরিবারের সান্নিধ্যহীনতা এবং আর্থিক টানাপোড়েন তাদের ভেতরেও এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত তৈরি করতে পারে। এই আত্মহনন কেবল একজন ব্যক্তির পরাজয় নয়, বরং এটি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংবেদনহীনতারই প্রতিফলন। সময় এসেছে পুলিশ সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে কোনো বিশেষ সুযোগ হিসেবে নয়, বরং তাদের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার। সরকারকে যেমন কর্মপরিবেশ ও বেতন কাঠামো সংস্কারে এগিয়ে আসতে হবে, তেমনি সাধারণ নাগরিকদেরও উচিত পুলিশের পেশাগত জীবনের কঠিন সংগ্রামকে সহমর্মিতার চোখে দেখা। একটি সুস্থ ও সংবেদনশীল সমাজ গঠনে যারা অতন্দ্র প্রহরী, তাদের নিজেদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা আজ আর কোনো গৌণ বিষয় নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এটি একটি অপরিহার্য সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার বিষয়।

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.