আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সহিংসতা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১০ দফা নির্দেশনা একটি প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট উদ্যোগ। তবে মাঠপর্যায়ে এর সুফল বাস্তবায়ন নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রবল সংশয় রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর অবকাঠামো, বিশেষ করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে তীব্র জনবল সংকট এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব এই পরিকল্পনার প্রধান অন্তরায়। নিবিড় তদারকি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি ছাড়া প্রশাসনিক এই নির্দেশ শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছাড়া আর কিছুই নয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে, এই উদ্যোগটি বাস্তবে রূপান্তর করতে হলে সবার আগে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সহিংসতার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মজুদ না থাকলে ১০ দফা নির্দেশনার লক্ষ্য পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই শুধু নির্দেশ জারি নয়, বরং বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো আমলে নিয়ে বিশেষ অর্থায়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে নির্বাচনী সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্তদের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে।
নির্বাচনী উত্তাপে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১০ নির্দেশনা কি শুধুই আনুষ্ঠানিকতা? নাকি জনসেবার আন্তরিক প্রয়াস? ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার তিক্ত বাস্তবতায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের চোখে উঠে এসেছে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক নানা দিক।
নির্দেশনা ১ মেডিকেল টিম গঠন : প্রতিটি সিটি করপোরেশনে ৬টি, বিভাগীয় পর্যায়ে ৪টি, জেলায় ৩টি, উপজেলায় ২টি এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ১টি করে মেডিকেল টিম গঠন করতে হবে । সিটি কর্পোরেশন থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ধাপে ধাপে মেডিকেল টিম গঠনের এই সরকারি নির্দেশনাকে বিশেষজ্ঞরা তৃণমূল পর্যায়ে জরুরি সেবা নিশ্চিতের একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন । তবে মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতি থাকায় এই বিশাল কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সংশয় রয়েছে ।
নির্দেশনা ২ অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুতি: জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় ২৪ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস প্রস্তুত রাখতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে ৯৯৯ হেল্পলাইন ও বিস্তৃত নেটওয়ার্ক সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবাকে সাধারণের নাগালে আনলেও, দক্ষ চালক ও লাইফ সাপোর্ট সরঞ্জামের চরম ঘাটতি একটি বড় সীমাবদ্ধতা। সেবার এই কাঠামোগত দুর্বলতা জরুরি মুহূর্তে মুমূর্ষু রোগীর জীবন রক্ষায় বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
নির্দেশনা ৩ ছুটি ও কর্মস্থলে উপস্থিতি: হাসপাতালের প্রধানদের নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকতে হবে। একান্ত প্রয়োজনে ছুটিতে থাকলে বিকল্প দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে নিয়োজিত করতে হবে । এমন উদ্যেগ শীর্ষ কর্মকর্তার উপস্থিতি প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বাড়াবে এবং দ্রুত জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করবে। বিশেষজ্ঞরা এমনটি মনে করলেও এর বিপরীতে দক্ষ বিকল্প নেতৃত্বের ঘাটতি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এ সিদ্ধান্ত শতভাগ বাস্তবায়ন কঠিন করে তুলতে পারে বলে মত তাদের।
নির্দেশনা ৪ জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত জনবল: সম্ভাব্য সহিংসতা বা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করতে হবে ।
নির্বাচনী সহিংসতা মোকাবিলায় সরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি হাসপাতালে দলীয় আনুগত্য ও রাজনৈতিক সক্রিয়তার কারণে জরুরি মুহূর্তে পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা বাস্তবক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠিন।
নির্দেশনা ৫ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ : সকল স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষণিক (২৪ ঘণ্টা) কন্ট্রোল রুম চালু রাখতে হবে।
নির্বাচনের দিন এমনিতেই চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানদের বড় একটি অংশ নির্বাচনী দায়িত্ব বা যাতায়াত সমস্যার কারণে অনুপস্থিত থাকতে পারেন। এছাড়া তীব্র জনবল সংকট, দুর্বল অবকাঠামো এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির অভাবই, সকল স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ২৪ ঘণ্টা কন্ট্রোল রুম বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায় বলে মত ডা. লেলিন চৌধুরীর।
নির্দেশনা ৬ নিরবচ্ছিন্ন সেবা: ইনডোর, ল্যাবরেটরি, ডায়ালাইসিস ও রেডিওলজি (সিটিস্ক্যান, এমআরআই) সেবা কোনোভাবেই বন্ধ রাখা যাবে না।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের জেলা হাসপাতালগুলোর প্রায় ৫৩% রেডিওলজি ও ইমেজিং যন্ত্রপাতি হয় অকেজো অথবা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক স্থানে নতুন যন্ত্র কেনা হলেও দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাবে সেগুলো বছরের পর বছর প্যাকেটবন্দী হয়ে পড়ে থাকে। অকেজো যন্ত্রপাতি, দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাব এবং তীব্র জনবল সংকটের কারণে নির্বাচনের দিনের বিশেষ পরিস্থিতিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্যাথলজি ও রেডিওলজি সেবা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
নির্দেশনা ৭ বেসরকারি হাসপাতালের বাধ্যবাধকতা: বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোতেও সার্বক্ষণিক ডাক্তার এবং জরুরি বিভাগ সচল রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে । ব্যবসায়িক মুনাফা ও সরকারি চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত প্র্যাকটিসের কারণে নির্বাচনের দিন বেসরকারি সেবা সচল থাকলেও, উচ্চমূল্য ও দুর্বল সরকারি তদারকি সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত জরুরি চিকিৎসাপ্রাপ্তি অনিশ্চিত ও ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
নির্দেশনা ৮ রেফারেল নির্দেশনা: কোনো রোগীকে অন্য হাসপাতালে রেফার করার আগে প্রাথমিক চিকিৎসা ও যথাযথ কাউন্সেলিং নিশ্চিত করতে হবে।
কমিশন বাণিজ্য ও সিন্ডিকেটের কারণে সরকারি হাসপাতালে রোগী রেফার করার প্রবণতা উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আর্থিক স্বার্থ জড়িত থাকায় নির্বাচনের জরুরি মুহূর্তে যথাযথ প্রাথমিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
নির্দেশনা ৯ জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম: জরুরি ওষুধ, রক্ত এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করতে হবে।
ওষুধের কৃত্রিম সংকট, কমিশন বাণিজ্য এবং প্যাথলজি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় নির্বাচনের দিন শুধুমাত্র দাপ্তরিক নির্দেশে হাসপাতালের চিরাচরিত অনিয়ম দূর করা অসম্ভব। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর মনে করেন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও কঠোর তদারকি ছাড়া জরুরি মুহূর্তে রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ ও প্যাথলজি সেবা নিশ্চিত করা কঠিন।
নির্দেশনা ১০ যোগাযোগ ও সমন্বয়: কোনো প্রতিষ্ঠান বা কার্যালয় টানা ৭২ ঘণ্টার বেশি বন্ধ রাখা যাবে না এবং জরুরি প্রয়োজনে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের সময় টানা ৭২ ঘন্টা তো দূর, কোন সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বা কার্যালয় ১ ঘণ্টার জন্যও বন্ধ রাখা দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই সংবিধান ও জরুরি সেবা আইন অনুযায়ী এই সময়ে বিশেষ সতর্কাবস্থা বাধ্যতামূলক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) নির্বাচনের সময় ১০ দফা জরুরি নির্দেশনা জারি করে, যেখানে ২৪ ঘণ্টা কন্ট্রোল রুম খোলা রাখা এবং নাগরিক সরকারি স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ নম্বরে নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিতের কথা বলা হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর মনে করেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১০ দফা নির্দেশনা কেবল একটি প্রশাসনিক দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকবে, নাকি জনসেবার প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে তা নির্ভর করছে, মাঠপর্যায়ের কঠোর তদারকি ও লজিস্টিক সাপোর্টের ওপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভঙ্গুর অবকাঠামো, জনবল সংকট এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে এই মহৎ উদ্যোগটি কাগজ-কলমে থেকে যাবে। তারা মনে করেন, সহিংসতা মোকাবিলায় কেবল নির্দেশ জারি নয়, বরং জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামের সহজলভ্যতা ও চিকিৎসকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









