বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এবং বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সরাসরি নির্বাচনের মাঠে না থাকলেও দলটি নানা নেপথ্য কৌশলে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত ও বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা চালাতে পারে এমনটি আশঙ্কা করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংশ্লিষ্টরা। জনসাধারণের মনেও এ নিয়ে রয়েছে ব্যাপক সংশয়।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমান সরকারকে একটি সফল ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে ব্যর্থ প্রমাণ করতে দেশজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টির পরিকল্পনা থাকতে পারে । তাদের মতে, নির্বাচনে তিন ধরনের অস্ত্রে নাশকতার ঝুঁকি রয়েছে। (১) উদ্ধার না হওয়া পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র; (২)সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ; (৩) আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হাতে থাকা সকল অস্ত্র। একই সাথে ভোট বানচালে চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে জনমতে শঙ্কা তৈরির অপচেষ্টাকেও অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এছাড়া প্রযুক্তিগত কারসাজির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে অস্থিতিশীলতা তৈরিতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক নেতা-কর্মীদের অপতৎপরতাকে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন গোয়েন্দারা। বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ধর্মীয় উসকানিকে ভোটারদের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিঘ্নিত করতে অশুভ শক্তির মাধ্যমে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির নীলনকশা থাকতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সূত্র বলছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে আওয়ামী লীগ আমলের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের একটি অংশ এখনো সক্রিয় থাকতে পারে এবং তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে নির্বাচনের সুষ্ঠ পরিবেশ বিঘ্নিত করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা এবং বিদেশে থাকা অন্য নেতারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি প্রচার চালিয়ে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং কর্মীদের আন্দোলনের উসকানি দিয়ে ঝামেলা পাকাতে পারেন পারেন- এমন আশঙ্কাও রয়েছে। তবে ভোট বানচালের প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের ভূমিকার বিষয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গেবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, উদ্ধার না হওয়া বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং সুষ্ঠ নির্বাচনের পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি থামানো না গেলে নির্বাচনের দিন নাশকতা ও সহিংসতা ঠেকানো প্রশাসনের জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা হয়ে উঠবে।
একই সাথে যোগ করে এ অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, লুণ্ঠিত অস্ত্রের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে যে কোন দলের এআই-জেনারেটেড ফেক নিউজ, যা মুহূর্তের মধ্যে ভোটারদের বিভ্রান্ত করে সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতিক দাঙ্গা উসকে দিতে সক্ষম। এ ব্যাপারে সাধারণ ভোটারদের উদ্দেশ্যে এ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ হলো- আবেগপ্রসূত বা উসকানিমূলক কোনো ভিডিও দেখলে তা শেয়ার করার আগে উৎস যাচাই করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ মনে করেন, একটি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারা বর্তমানে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রধান অন্তরায়, যা নির্বাচনের নৈতিক বৈধতাকে সংকটের মুখে ফেলবে। তিনি বলেন, যদি প্রধান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হয়, তবে সেই সুযোগে ষড়যন্ত্রকারীরা ভোট বানচালের সুযোগ পাবে, যা দেশের গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতাকে আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের সংকটে ফেলবে। ড. সাব্বিরের মতে, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় কেবল পেশিশক্তি বা প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, বরং জাতীয় ঐকমত্য এবং সেনাবাহিনীর সক্রিয় তদারকিতে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্পন্ন করাই হবে বর্তমান সংকটের টেকসই সমাধান।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ ভোট বানচালের নাশকতায় আওয়ামী লীগের সরাসরি জড়িত থাকার আশঙ্কা নাকচ করে দিলেও ভিন্ন এক সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন, বিদেশে অবস্থানরত দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব ও লবিস্টরা বর্তমান সরকার ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে যে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে, তাতে নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের আন্তর্জাতিক বৈধতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক এই বিশ্লেষকের মতে, আওয়ামী লীগের জনসমর্থনকে যদি বিদ্যমান দলগুলো গণতান্ত্রিক মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে না পারে, তবে সেই অসন্তুষ্ট গোষ্ঠীটিকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী মাঠে অস্থিতিশীলতা ও নাশকতার ঝুঁকি থেকেই যায়। অধ্যাপক ইমতিয়াজের মতে, ভোটের সার্বভৌমত্ব জনগণের ওপর নির্ভর করলেও নির্বাচনের পরের চ্যালেঞ্জগুলো হবে মূলত আন্তর্জাতিক। নতুন সরকার যদি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে ব্যর্থ হয়, তবে রাষ্ট্র এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
নির্বাচন বিশ্লেষক ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলিমের পর্যবেক্ষণ বলছে, নির্বাচন বানচালে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর কোনো দালিলিক ভিত্তি আপাতত পাওয়া যায়নি। তবে নির্বাচনকালীন পরিস্থিতির মূল ঝুঁকিগুলো হিসেবে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেন এ নির্বাচন বিশ্লেষক।
প্রথমত স্থানীয় পর্যায়ে এক দলের আধিপত্য না থাকায় অন্য দলগুলো প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, যা থেকে নির্বাচনে অংশ নেয়া দলগুলোর মধ্যে দখলদারিত্ব বা সহিংসতার নতুন ধরন তৈরি হতে পারে । দ্বিতীয়ত নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে গিয়ে প্রার্থীরা নির্বাচনী বিধিমালা উপেক্ষা করতে পারেন। আর তৃতীয়ত, একটি সুষ্ঠ নির্বাচনের জন্য কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছাই নয়, বরং স্থানীয় পর্যায়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









