‘জুলাই বীর সম্মাননা’ নামে নিহত ও আহত পরিবারের হাতে তুলে দেয়া ১২০০ চেক বাউন্স হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর এই চেকগুলো দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম ৪ (সীতাকুন্ড) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর উদ্যোগে। অ্যাকাউন্টটি তার মেয়ে মেহরীন আনহার উজমার নামে। জেএএম সংস্থার উদ্যোগে গত ৭ জানুয়ারি রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে ৫০ হাজার টাকা করে ১২শ’ পরিবারের হাতে চেকগুলো তুলে দেওয়া হয়।
সম্মাননা পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন- ৮৪৪ জুলাই শহীদ, ১০২ সাংবাদিক এবং আন্দোলনে গুরুতর আহত ও অগ্রণী ভূমিকা রাখা আরো ২৫৪ জন। অথচ দীর্ঘ একমাস অতিবাহিত হলেও সেই চেকের টাকা উত্তোলন করতে পারছে না সংশ্লিষ্টরা। জেএএম সংস্থার হিসাবে টাকা না থাকায় একের পর এক চেক বাউন্স হচ্ছে। আবার মিলছে না স্বাক্ষরও। যদিও সংস্থাটির সভাপতির দায়িত্বে চট্টগ্রাম ৪ (সীতাকুন্ড) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মেয়ে মেহরীন আনহার উজমার।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, অনুষ্ঠানের পর চেক নিয়ে পূবালী ব্যাংকে গেলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই হিসাব নাম্বারে মাত্র ২০ হাজার টাকা রয়েছে বলে জানায়। পরে আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ৩ দফা সময় দেন। সর্বশেষ ৫ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকে গিয়েও টাকা উত্তোলন সম্ভব হয়নি।
বিষয়টি আসলাম চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষন করা হলে তিনি গতকাল রাতে দৈনিক এদিনকে জানান, গেজেটভূক্ত জুলাই যোদ্ধাদের জেএএম সংস্থা কর্তৃক ৫০ হাজার টাকা করে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা প্রতিনিয়ত ক্যাশ হচ্ছে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ টাকা পাচ্ছে। ইতিমধ্যে ৪০০ জনের চেক ক্যাশ হয়েছে। তবে একসাথে সবাই ব্যাংকে গিয়ে ভীড় করলে টাকা পাচ্ছে না বলেও তিনি স্বীকার করেন। তিনি আরও বলেন, আগামী দু’য়েক দিনের মধ্যেই সব চেক ক্যাশ করা হবে।
আসলাম চৌধুরী আশ্বাস দিলেও চেকগ্রহীতারা জানান, আগামীকাল বুধবার থেকে টানা ৪দিন ব্যাংক বন্ধ। তাহলে কিভাবে আজকালের মধ্যে টাকা পাব। ভোটের আগে তিনি জুলাই যোদ্ধাদের সাথে প্রতারণা করছেন। যেভাবে ব্যাংকে খেলাপি হয়েও প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
জানা গেছে, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরীকে ঘিরে জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহত পরিবারের সম্মাননা অনুদানের চেক নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, তার প্রতিষ্ঠানের দেয়া একাধিক চেক ব্যাংকে জমা দিতে গিয়ে বারবার বাউন্স হচ্ছে ফলে ভুক্তভোগীরা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। গত ৭ জানুয়ারি ঢাকার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনে শহীদ, আহত ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা প্রায় ১২০০ জনকে ক্রেস্ট ও ৫০ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হয়। বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান ‘জেএম সংস্থা’র উদ্যোগে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে তিনি নিজেই শহীদ পরিবারের হাতে চেক তুলে দেন বলে জানা যায়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে চেক তুলে দেন বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ও চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেএএম সংস্থার চেয়ারম্যান মেহরীন আনহার উজমা। তিনি আসলাম চৌধুরীর একমাত্র কন্যা। জেএএম সংস্থাই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা।
অনুষ্ঠানের পর চেক নিয়ে ব্যাংকে গেলে সহায়তা পাওয়া পরিবারগুলো জানতে পারে, ব্যাংক হিসাবে পর্যাপ্ত টাকা নেই। ফলে প্রত্যেকের চেক বাউন্স হয়। চেকে স্বাক্ষর রয়েছে আসলাম চৌধুরীর কন্যা মেহরীন আনহার উজমার। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চেকগুলো ব্যাংকে জমা দিতে গেলে সংশ্লিষ্ট হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় সেগুলো বাউন্স হয়। আয়োজকদের সাথে চেকগ্রহীতারা যোগাযোগ করলে ১৬ জানুয়ারি হিসাবটিতে টাকা জমা হওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু ১৮ জানুয়ারি ব্যাংকে গিয়ে দেখা যায়, হিসাবে মাত্র ২০ হাজার টাকা রয়েছে। এরপর বিভিন্ন সময় নতুন করে আশ্বাস দেওয়া হলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ২৮ জানুয়ারির মধ্যে টাকা না দিলে আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হলে ৩ ফেব্রুয়ারি অর্থ জমার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু সেদিনও চেক বাউন্স হয়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সবাইকে আবার ব্যাংকে যেতে বলা হয়। কিন্তু সকাল সাড়ে ১০টায় গিয়ে দেখা যায় হিসাবে মাত্র ১৬ হাজার টাকা রয়েছে। ভুক্তভোগিদের অভিযোগ, সম্মাননার নামে রাজনৈতিক প্রচারের জন্য এই আয়োজন করা হয়েছে, কিন্তু অর্থ পরিশোধে আন্তরিকতা নেই। ব্যাংক সূত্রে আরও জানা গেছে, শুধু ব্যালেন্স সংকট নয়, কিছু চেকে স্বাক্ষর না মেলায় সেগুলো গ্রহণ করা হচ্ছে না। এ নিয়ে ভুক্তভোগীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
জুলাই আন্দোলনে আহত একাধিক চেকপ্রাপ্ত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত কেউই টাকা পাননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ভুক্তভোগির অভিযোগ সম্মাননার কথা বলে আমাদের অপমান করা হয়েছে। একাধিকবার ব্যাংকে চেক নগদায়ন করতে গিয়ে অপমান বোধ করেছি। অনুদানের চেক হাতে দিয়ে ছবি তুলে আমাদের চরম অপমান করা হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের এক সংগঠক বলেন, এটা স্পষ্ট প্রতারণা। সম্মাননার নামে শহীদ পরিবার ও আহত কর্মীদের পরিকল্পিতভাবে অপমান করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী বলেন, চেকগুলো তার ম্যানেজার দিয়েছেন এবং সে সময় অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। চলতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে সবার টাকা পরিশোধ হয়ে যাবে। এটি ইচ্ছাকৃত নয়, ব্যবসায়িক টানাপড়েনের কারণে সমস্যা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা লায়ন আসলাম চৌধুরীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪৫৬ কোটি ৯৫ লাখ ৭ হাজার টাকা। তবে অন্য প্রার্থীদের তুলনায় তার ঋণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে তার মোট ঋণ প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। পাঁচটি ব্যাংক ও অন্যান্য খাতে তার ঋণ ৩৫৪ কোটি ৪১ লাখ ৬৩ হাজার ২৬৯ টাকা। এ ছাড়া জামিনদার হিসেবে ঋণ রয়েছে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিচালক হিসেবে ২৮৫ কোটি টাকা। সম্পদের তুলনায় ঋণের পরিমাণ ২৪ দশমিক ২৫ গুণ বেশি।
যদিও হলফনামায় আসলাম চৌধুরী উল্খে করেন, এসব ঋণের বড় অংশই জামিনদার ও পরিচালক থাকার কারণে যুক্ত হয়েছে। এদিকে গত ৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহালের হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন আপিল বিভাগ।
আদালত বলেন, আসলাম চৌধুরী নির্বাচন করতে পারবেন, তবে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফল স্থগিত থাকবে এবং ফল প্রকাশ হবে না। এর আগে ৩ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। তবে ঋণখেলাপির অভিযোগে নির্বাচন কমিশনে আপিল করা হয়। জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী অভিযোগটি করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকও পৃথক আপিল করে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









