আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় মসনদে বসা নতুন সরকারের জন্য ক্ষমতা গ্রহণ কোনো সাধারণ পালাবদল নয়। এটি একটি সংকটময় উত্তরাধিকার বলা যেতে পারে। কেননা একদিকে আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি আর ডলার সংকটে হাঁসফাঁস করা অর্থনীতি, অন্যদিকে রাজনৈতিক বৈধতা ও কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা রক্ষার ত্রিমুখী চাপ। এসব কিছু মিলিয়ে বিজয়ী নতুন সরকারকে শুরু থেকেই খাদের কিনারায় দাঁড় করাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারের ধারা বজায় রেখে শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করা এবং আইএমএফের কঠিন শর্তের মুখে জনস্বার্থ রক্ষা করা হবে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
বিশেষ করে, নির্বাচনকে প্রশ্নাতীত রাখা এবং বিরোধী পক্ষকে আস্থায় নিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে না পারলে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও বৈদেশিক বিনিয়োগ উভয়ই মুখ থুবড়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। মূলত, প্রশাসনিক সংস্কারের চেয়েও এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা হবে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি ও গণতান্ত্রিক আস্থার পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা। যে কারণে নতুন সরকার বিজয়ের মালা গলায় পরে ক্ষমতায় এলেও সেই মালায় ফুলের তুলনায় কাঁটার সংখ্যাই থাকবে বেশি। নতুন চেয়ার তাই তাদের জন্য হতে পারে কাঁটার সিংহাসন। এমনই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
অর্থনীতির অগ্নিপরীক্ষা: সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দায়িত্ব নিয়ে নতুন সরকারের কোনো মধুচন্দ্রিমার সুযোগ নেই বরং তারা পা রাখছে এক চরম অস্থির অর্থনীতির আগ্নেয়গিরিতে। বছরের পর বছর ৯ শতাংশের ওপরে থাকা মূল্যস্ফীতি, সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ৮.১৭ থেকে লাফিয়ে ৮.৪৯ শতাংশে পৌঁছানো মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী। গ্রাফ স্পষ্ট করে দেয় যে, বাজার এখন সাধারণের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বলা হচ্ছে ,নতুন সরকার কেবল একটি অর্থনীতি নয়, বরং একটি ক্রনিক ইনফ্লেশন বা দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির দুষ্টচক্র উত্তরাধিকার সূত্রে পাচ্ছে। ড. ফাহমিদা খাতুনের বিশ্লেষণে কয়েকটি গভীর সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে রোজা ও ঈদের বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে মূল্যস্ফীতির নতুন উল্লম্ফন, অন্যদিকে আইএমএফের শর্ত মেনে ডলারের দাম বাড়ানোর চাপ- এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ। আইএমএফের ফর্মুলায় টাকার অবমূল্যায়ন ঘটলে মূল্যস্ফীতি যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে, তা নিশ্চিত। এমন পরিস্থিতিতে পলাতক হুন্ডি মাফিয়াদের প্রত্যাবর্তন ঠেকিয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখাই হবে নতুন সরকারের টিকে থাকার মূল লাইফলাইন। মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখা আর রপ্তানি আয়ের পালে হাওয়া লাগানো- এই দুই কঠিন ফ্রন্টে জয়ী হতে না পারলে নতুন সরকার শুরুতেই এক দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে স্থবির হয়ে পড়া উৎপাদন ও বিনিয়োগ ব্যবস্থায় প্রাণসঞ্চার করা। গত দেড় বছরে অর্থনৈতিক সংস্কারের কথা বলা হলেও বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে দৃশ্যমান কোনো সাফল্য আসেনি, যার ফলে নিম্নমুখী রপ্তানি আয় এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এখন দেশের অর্থনীতির প্রধান ক্ষত। কেবল কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজার ধরা নয়, বরং অভ্যন্তরীণ শিল্প খাতকে সচল করতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের জোগান নিশ্চিত করাই হবে সরকারের প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ। একদিকে চড়া সুদহার ও ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা কমে যাওয়া, অন্যদিকে জ্বালানি সংকটে ধুঁকতে থাকা শিল্প মালিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে একটি দীর্ঘমেয়াদী লড়াই। ভোক্তা সাধারণকে বাজার সিন্ডিকেটের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে কঠোর বাজার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিনিয়োগের নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে। মূলত, কাগজে সংস্কারের বদলে নতুন সরকারকে এমন এক টেকসই কাঠামো দাঁড় করাতে হবে, যেখানে বিনিয়োগের নিরাপত্তা আর শিল্পের জ্বালানি নিশ্চিতের মাধ্যমেই কেবল ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করা সম্ভব হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এই পরিচালক মনে করেন, সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ হবে বেকারত্বের ক্রমবর্ধমান হার কমিয়ে আনা। যেখানে বিগত দেড় বছর ধরে বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং শিল্প খাতে জ্বালানি সংকটের কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে আছে, সেখানে প্রতিবছর শ্রমবাজারে আসা লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে হিমালয় টপকানোর মতো কাজ।
ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, কেবল সরকারি নিয়োগ দিয়ে এই বিশাল বেকারত্ব ঘোচানো অসম্ভব। এজন্য প্রয়োজন বেসরকারি খাতে জোয়ার আনা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করা। যদি নতুন প্রশাসন দ্রুত শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা এবং ঋণ প্রবাহ সচল করতে না পারে, তবে কর্মহীন যুবসমাজের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেকোনো সময় বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতার জ্বালানি হিসেবে কাজ করতে পারে। মূলত, নতুন সরকারের স্থায়িত্ব ও সাফল্য নির্ভর করছে তারা কতটা দ্রুত কর্মহীন প্রবৃদ্ধির দুষ্টচক্র ভেঙে উৎপাদনশীল খাতে প্রাণসঞ্চার করতে পারছে, তার ওপর।
রাজপথের সম্ভাব্য 'দ্বিমুখী' উত্তাপ: বিএনপি জোট যদি সরকার গঠন করে তাহলে জামায়াত ইসলামী জোট সংসদের পাশাপাশি রাজপথে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনে মরিয়া থাকবে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ তাদের গত দেড় দশকের শাসনভার হারানোর পর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নামার আপ্রাণ চেষ্টা করবে। ফলে আদর্শিকভাবে বিপরীত মেরুর হলেও আওয়ামী লীগ ও জামায়াত উভয়ই বিএনপির জন্য রাজপথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে এনসিপির মতো তরুণ শক্তি। জামায়াত তাদের সুশৃঙ্খল ক্যাডারভিত্তিক সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে রাজপথে একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। নির্বাচনের ফলাফল বা সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট নীতির যেমন ইসলামপন্থী ইস্যু বা ভারতের সাথে সম্পর্ক বিরোধিতায় তারা কঠোর হরতাল বা অবরোধের মতো কর্মসূচি দিতে পারে।
আওয়ামী লীগ বড় ধরনের জনসভা করতে না পারলেও শহরভিত্তিক ছোট ছোট ঝটিকা মিছিল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের ব্যর্থতা প্রচারে সক্রিয় থাকতে পারে। বিএনপি সরকারকে চাপে রাখতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত সরাসরি জোট না করেও কৌশলগতভাবে একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে পারে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্তি বিভক্ত হয়ে, সরকারকে প্রশাসনিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা দিতে পারে। নতুন সরকারের সামনে থাকা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোকে (মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট) পুঁজি করে রাজপথে জনরোষ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করবে উভয় পক্ষই। বিশেষ করে আইএমএফের শর্ত পূরণ বা বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাকে তারা বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। বিএনপি সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে রাজপথে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঝুঁকিও প্রবল। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা প্রকারান্তরে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করবে। বিএনপি সরকার গঠন করলে তারা কেবল একটি অর্থনৈতিক ধ্বংসস্তূপই নয়, বরং একটি বিস্ফোরণোন্মুখ রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক চাতুর্য আর জামায়াতের সাংগঠনিক কঠোরতা- এ দুইয়ের দ্বিমুখী উত্তাপ সামলে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই হবে নতুন প্রধানমন্ত্রী তথা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা।
অপরদিকে জামায়াত ইসলামী জোট সরকার গঠন করলে তা বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয় দলের জন্যই এক অস্তিত্ব সংকটের কারণ হতে পারে। আওয়ামী লীগের জন্য জামায়াতের শাসন মানে তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের চূড়ান্ত পরাজয় এবং আইনি ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগের আশঙ্কা। অন্যদিকে, বিএনপির জন্য জামায়াত একটি বড় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হবে, যারা বিএনপির ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংকে হানা দিতে সক্ষম । যদি জামায়াত ক্ষমতায় আসে, তাহলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সরাসরি জোটবদ্ধ না হয়েও রাজপথে একই লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামতে পারে। দলটি জামায়াত সরকারকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিরোধী ও মৌলবাদী হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরার চেষ্টা করতে পারে। তারা রাজপথে ছোট ছোট ঝটিকা মিছিল ও প্রচারণার মাধ্যমে সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
অপরদিকে বিএনপি বৃহত্তর রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের দাবি করে রাজপথে ব্যাপক গণজমায়েত ও শান্তিপূর্ণ বা কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। যখন বিএনপি রাজপথের প্রধান শক্তি হিসেবে সরকারকে মোকাবিলা করবে, তখন আওয়ামী লীগ ছায়াশক্তি হিসেবে বা প্রচ্ছন্ন সমর্থনে সরকারের প্রশাসনিক কাজে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে পারে। ‘প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের’ মাধ্যমে জামায়াত ক্ষমতায় এলে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে পুনর্বিবেচনা করতে পারে। এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ বৈশ্বিক পর্যায়ে সরকারকে একঘরে করার চেষ্টা করতে পারে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার গঠন হলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক জোট না হলেও, “শত্রুর শত্রু বন্ধু নীতিতে” তারা রাজপথকে উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। এই দ্বিমুখী চাপে নতুন সরকার যদি দ্রুত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে ব্যর্থ হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের উন্নয়নকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট কেবল একটি সরকার নির্বাচনের লড়াই নয়, এটি বাংলাদেশের আগামীর গতিপথ নির্ধারণের লড়াই। বিএনপি যখন মসনদ দখলের মাধ্যমে দেড় যুগের রাজনৈতিক তৃষ্ণা মেটাতে চাইবে, জামায়াত তখন গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ’ডিএনএ’ বদলে দিয়ে নিজেদের অবস্থানকে অপরিহার্য করে তোলার চেষ্টা করবে। জামায়াতের এই অদৃশ্য শিকল যদি সফল হয়, তাহলে বিএনপি সরকার গঠন করলেও তাদের প্রতিটি কদমে ‘বিপ্লবের পাহারাদার’ দাবি করা জামায়াত জোটের মুখোমুখি হতে হবে।
অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ এই পরিস্থিতিকে দেখছেন অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টিতে। দৈনিক এদিন-এর সাথে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ক্ষমতার চাবিকাঠি থাকবে বিএনপির হাতে, কিন্তু সেই চাবি ঘোরানোর কলকব্জা নিজেদের হাতে জামায়াত রাখতে চাইলেও রাষ্ট্র চলবে সংবিধানসম্মতভাবে। তার মতে, বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে যদি জামায়াত জোটের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোতে হাত না দেয় বা পিছিয়ে যায়, তবে জামায়াত জোট সেটিকে ”বিপ্লবের সাথে বেঈমানি” আখ্যা দিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত করার মোক্ষম সুযোগ নিতে পারে।
বৈশ্বিক স্বীকৃতির লড়াই : আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা বদলের লড়াই নয়, বরং বাংলাদেশের বিশ্ব স্বীকৃতির এক চরম সন্ধিক্ষণ। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, নতুন সরকারের আসল যুদ্ধ শুরু হবে ভোটের পর আন্তর্জাতিক বৈধতার টেবিলে। যদি এই নির্বাচন বৈশ্বিক মহলে ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতা হারায়, তবে নতুন সরকার এক কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার বিষচক্রে আটকা পড়বে। সার্বভৌমত্ব জনগণের হাতে থাকলেও, উন্নয়নের চাকা ঘোরানোর জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের চাবিকাঠি মূলত আন্তর্জাতিক মহলের আস্থার ওপর নির্ভরশীল। এই আস্থার ঘাটতি দেখা দিলে কেবল বিদেশি সাহায্যই বন্ধ হবে না, বরং রাষ্ট্র এক গভীর অনিশ্চয়তার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে। মূলত, রাজপথের উত্তাপ সামলানোর চেয়েও কঠিন হবে বিশ্বদরবারে সরকারের নৈতিক অবস্থান প্রমাণ করা। যেখানে ব্যর্থতার অর্থ হলো দেশকে এক দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নির্বাসনের দিকে ঠেলে দেওয়া।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করেন, কাগজে-কলমে জনগণ ভোট দিলেও আধুনিক বিশ্বে একটি সরকারের কার্যকরভাবে টিকে থাকা নির্ভর করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ওপর। যদি বড় দেশগুলো যেমন যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ বা ভারত এই নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক বা সুষ্ঠ মনে না করে, তবে নতুন সরকার অভ্যন্তরীণভাবে শক্তিশালী হলেও বৈশ্বিক মঞ্চে হবে দুর্বল। এটি সরকারকে আন্তর্জাতিক লবিং ও চাপের মুখে সারাক্ষণ তটস্থ রাখবে। তাদের মতে, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন মানেই হলো বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের পিঠটান। কোনো বড় কোম্পানি এমন দেশে টাকা বিনিয়োগ করতে চায় না যেখানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বা স্যাংশনের ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সুশাসনের যে শর্ত দেয়, বৈধতার সংকটে থাকা সরকারের পক্ষে সেই দরকষাকষিতে জেতা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি দেশের ডলার সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে। যদি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সরকার গ্রহণযোগ্যতা হারায়, তবে বিরোধী দলগুলো বিশেষ করে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ- ‘যারা ক্ষমতায় থাকবে না’ বিশ্বদরবারে সরকারের বিরুদ্ধে ‘গণতন্ত্র হরণ’-এর প্রচার চালানোর সুযোগ পাবে। এতে রপ্তানি বাজারে জিএসপি সুবিধা বা আরএমজি অর্ডারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। মূলত, একটি দেশের সার্বভৌমত্ব তখন হুমকির মুখে পড়ে যখন তার অর্থনীতি ও কূটনীতি, বিদেশের দয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সহজ কথায়, বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হবে এটিই যে, তারা জনগণের সরকার হিসেবে দাবি করলেও বিশ্ব যদি তাদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি না দেয়, তবে রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাবে।
অর্থনীতি, রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতামতের আলোকে বলা যায়, নবনির্বাচিত সরকারের জন্য আগামী দিনগুলো হবে এক নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধের নামান্তর। রাজপথের রাজনৈতিক উত্তাপ সামলানো যতটা জরুরি, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে সাধারণ মানুষের হেঁশেলের আগুন নেভানো এবং স্থবির অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করা। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সংকটের পাহাড় ডিঙিয়ে তারা কতটা জনস্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে তাদের টিকে থাকা। আন্তর্জাতিক মহলের কূটনৈতিক সমর্থন আদায় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য কেবল তাত্ত্বিক সংস্কার নয়, বরং কর্মসংস্থান ও বাজার নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান ফলাফল দেখানো অপরিহার্য। যদি নতুন সরকার অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে রাষ্ট্র এক দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে হারিয়ে যেতে পারে।
তাই বিশ্লেষকদের মত, এই মাহেন্দ্রক্ষণে কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকা নয়, বরং জনমুখী রাজনীতি ও অর্থনৈতিক অধিকার পুনরুদ্ধার করাই হবে নতুন সরকারের ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেওয়ার একমাত্র পথ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









