দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়েছিলেন শেলী বেগম। এদিন-কে বললেন, ‘আমার ভোটটা দিতে পেরেছিলাম। অনেকেই নাকি পারেননি। কেন্দ্রে মারামারি লাগে। পুলিশের সাথে কার মারামারি হলো জানি না। ভয়ে তাড়াতাড়ি চলে এসেছিলাম।’ একইভাবে ভোট দিতে গিয়ে ফিরে এসেছিলেন রমজানও। তার ভোট নাকি দেয়া হয়ে গেছে। প্রতিবাদ করলে মারল পুলিশ। কিন্তু এবার কী হবে—তার মনে সেই প্রশ্ন।
পুলিশ বাহিনীতে এখনো আওয়ামী লীগ আমলের ১৬ হাজার ২৯৯ জন ‘পুলিশ’ রয়েছেন। সে সময় তারা লীগ সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে ছিলেন বেপরোয়া। জনগণ সেই হিসাবও মিলিয়ে দেখছে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে না পেরে ফিরে এসেছিলেন রমজান। এবারের নির্বাচনে পুলিশের সুষ্ঠু ভূমিকা আশা করেন তিনি। রমজান বলেন, ‘এবার শুনেছি পুলিশ অনেক নিরাপত্তা দিবে। আশা করি আগেরবারের মতো হবে না। পুলিশ জনগণের বন্ধু হয়েই কাজ করবে।’
রমজানের মতো অনেকের আশার আলোর সাথে মিলে যায় ডিএমপি কমিশনার সাজ্জাদ আলীর কথাও। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিরাপত্তা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন সাজ্জাদ আলী। নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে যেন সংঘটিত হয়, সেটি নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর সুযোগ নিলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ সবশেষে আইজিপি বাহারুল আলমও জনগণকে নিরাপত্তার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন।
এবার নির্বাচনে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় মোট ২ হাজার ১৩১টি ভোট কেন্দ্র রয়েছে। অবস্থান, ভোটারের সংখ্যা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ভোটকেন্দ্রগুলোকে দুইটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। গুরুত্বপূর্ণ ১৬১৪টি ভোটকেন্দ্রগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে। যেগুলোতে ন্যুনতম ৪ জন করে এবং সাধারণ ৫১৭টি কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। যেগুলোতে তিনজন করে পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি কন্ট্রোলরুমের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের জন্য থাকবে বডি ওর্ন ক্যামেরা। ভোটকেন্দ্রের বাইরে নিরাপত্তার জন্য থাকবে ১৮০টি স্ট্রাইকিং টিম ও ৫১০টি মোবাইল টিম। এছাড়া ঢাকা মহানগরীর আটটি ডিভিশনে আটটি আলাদা কন্ট্রোল রুম এবং চারটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হবে। ডিএমপি কমিশনার বলেন, সুবিধাজনক স্থানে মোতায়েন থাকবে স্পেশাল রিজার্ভ ফোর্স। ঊর্ধ্বতন কর্মকতাদের সরাসরি নেতৃত্বে থাকা এসব ফোর্স প্রয়োজনে দ্রুত যেকোন স্থানে মোতায়েন করা যাবে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য সোয়াট, বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, ডগ স্কোয়াড, ক্রাইমসিন ভ্যান ও অশ্বারোহী পুলিশ মোতায়েন থাকবে।’
যেমন ছিল ২০১৮ সালের ভোটে নিরাপত্তা
২০১৮ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিলো একপাক্ষিক। যেখানে ভোট চুরি, আগের রাতে ব্যালট বাক্স চুরি, একজনের ভোট আরেকজন দেয়াসহ মৃত ব্যক্তির ভোটও আরেকজন দিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সে সময়ের ভোটকেন্দ্রের প্রত্যক্ষদর্শী এবং ভোটার মো. এনামূল এদিন-কে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন ভোটের দিন সারাদেশে সব ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও সব দলের প্রার্থীর জন্য সেটা নিরপেক্ষ ছিলো না। পুলিশও তখন দলীয় সরকারের হয়ে কাজ করেছে। যেখানে পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা সবার আগে জরুরি, সেখানে তারা কোনো দল বা সরকারের হয়ে কাজ করলে জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়।’ তাঁর মতে, ‘দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীদের নিরাপত্তা তো দেয়া হয়নি, বরং তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। এবার সব পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা আশা করি, পুলিশ তাদের সঠিক দায়িত্ব পালন করবে এবং আমরা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন পাব।’
আরেকজন ছিলেন সে সময়ের পোলিং অফিসার সালমা আক্তার। পেশায় শিক্ষক। তিনি এদিন-কে বলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনে আমি পোলিং এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। আমার কেন্দ্রে পুলিশ সদস্যরা কেন্দ্রের মুল দরজা বন্ধ করে রেখেছিল। কাউকে প্রবেশ করতে না দিয়ে কেন্দ্রের ভেতরে সরকার সমর্থক প্রার্থীর পক্ষে ব্যালট পেপারে সিল মারছিল, আর পুলিশ সেটা পাহাড়া দিচ্ছিল। এমনকি যারা সিল মারছিল, আমরা প্রতিবাদ করলে তারা চুপ থাকতে হুমকি দিচ্ছিল। কিন্তু পুলিশের ভ্রুক্ষেপ ছিল না সেদিকে। কী যে আতঙ্ক ছিলো! এবার যেন এমন না হয়।’
‘আওয়ামী’ পুলিশ কতজন
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পুলিশের মোট সদস্য সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার (সিভিল সদস্যসহ)। এর মধ্যে পোশাধারী পুলিশ সদস্যের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ২ হাজার এবং প্রায় ১১ হাজার সিভিল সদস্য কর্মরত আছেন। কনস্টেবল থেকে আইজিপি পর্যন্ত এই জনবলের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার কনস্টেবল কর্মরত রয়েছেন। মোট জনবল প্রায় ২,১৩,০০০। এর মধ্যে পোশাকধারী পুলিশ প্রায় ২,০২,০০০। সিভিল সদস্য প্রায় ১১,০০০ জন।
পুলিশ-জনসংখ্যা অনুপাত: প্রায় ১ : ৮০০, ডিএমপি (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ)। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত এক বছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পুলিশ বাহিনীতে মোট ১৫,৮৫১ জন সদস্য নিয়োগ দিয়েছে। কনস্টেবল থেকে সাব-ইন্সপেক্টর বা এসআই পদমর্যাদা পর্যন্ত। এ ছাড়া ৪৬তম বিসিএস-এর মাধ্যমে ৪৮ জন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) নিয়োগের গেজেট সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে (ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। এর বাইরে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আরও ৪,০০০ সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নিয়োগ পদ্ধতিতে বড় ধরনের সংস্কার আনা হয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
কিন্তু আওয়ামী লীগ শাসনামলে পুলিশ ছিলো মোট ২,১৩,০০০ জন। ২০২৪ এর পট পরিবর্তনের পরে প্রায় ১৬,১০০ জন বাড়ে। এখন আওয়ামী লীগ আমলের পুলিশ রয়েছে ১,৯৬৭০১। সে হিসেবে এখনো ১৬ হাজার ২৯৯ জন আওয়ামী আমলের পুলিশ রয়েছে পুরো বাহিনীতে। সে সময় যাদের ভূমিকা ছিলো আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে বেপরোয়া। তারা কি এখন নিরপেক্ষ থাকবে? সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









