অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে এসে ‘বিতর্কিত’ প্রকল্প অনুমোদন নিয়ে চলছে আলোচনা- সমালোচনা। বিশেষ করে ঢাকা ওয়াসা প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমি স্থাপন প্রকল্পের মতো কিছু প্রকল্প নিয়ে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ সৃষ্টি করেছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তড়িঘড়ি করে এসব প্রকল্প অনুমোদনের কারণে সমালোচিত হচ্ছে বর্তমান সরকার।
অভিযোগ উঠছে, এই প্রকল্পগুলো অনুমোদনে রাজনৈতিক চাপ, স্বচ্ছতার অভাব এবং জনগুরুত্বপূর্ণতার চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও সুশাসনের প্রশ্ন তোলে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একইভাবে ঠিক ভোটের মাত্র একদিন আগে শেষ কর্মদিবসে নজিরবিহীন লুটপাটের আয়োজন করে বিদায় নিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের আরেক উপদেষ্টা। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প তড়িঘড়ি করে অনুমোদন দেন। যা পুরোটাই ‘লুটপাটের মহোৎসব’ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভোটের একদিন আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ কর্মদিবসে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি বৃহৎ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে কোনো রকম নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে লুটপাটের উদ্দেশ্যে তড়িঘড়ি করে এই প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছেন। যা ‘ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি)’ কার্যক্রমের আওতায় নামসর্বস্ব ২৪৮ এনজিওকে ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প দেয়া হয়েছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এ প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটি অনুমোদনের আগেই প্রতিটি এনজিও থেকে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা করে উৎকোচ নেন উপদেষ্টার দপ্তরের এক কর্মকর্তা। অভিযোগের বিষয়ে মহিলা ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি। গতকাল একাধিকবার তার ব্যক্তিগত মোবাইলে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
জানতে চাইলে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ (এনডিসি) দৈনিক এদিনকে বলেন, গত মঙ্গলবার মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি)’ প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবারই সংশ্লিষ্ট এনজিও সংস্থাগেুলোকে চিঠি দেয়া হয়েছে। যদি কেউ চিঠি না পেয়ে থাকে আগামী রোববার পেয়ে যাবে। তড়িঘড়ি করে প্রকল্প অনুমোদন দেয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তড়িঘড়ি ঠিক না, আরো একমাস আগেও প্রকল্পটি অনুমোদন হতে পারত। প্রকল্পটি যথাযথ নিয়মকানুন মেনেই অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট এনজিও সংস্থার কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করছে। উপদেষ্টার ইচ্ছায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
জানা গেছে, ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি) হলো মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর পরিচালিত একটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। যা আগে ভিজিডি নামে পরিচিত ছিল। এই কর্মসূচির লক্ষ্য দরিদ্র, দুস্থ ও ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, যার মাধ্যমে তারা প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণে খাদ্য সহায়তা (চাল) এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ (যেমন আয়-উৎপাদনশীল কাজে) পায়। এতে তারা স্বাবলম্বী হতে পারে এবং দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। এই প্রকল্পের দেশের দরিদ্র ও দুস্থ নারীরা উপকারভোগী হবেন। প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল (সাধারণত ৩০ কেজি বা তার বেশি) দেয়া হয়। সাথে আয়-বর্ধক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা থাকে, যা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)-এর মতো সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীরা যেন নিজস্ব ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করতে পারে, সেভাবে তাদের ক্ষমতায়ন করা হয়।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মহিলা অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, শেষ মুহূর্তের এই অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে উপদেষ্টার দপ্তর ও প্রশাসনের একটি অংশের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর গত বছরের জানুয়ারিতে ভিডব্লিউবি কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সেবা প্রদানকারী নির্বাচন করতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে সারাদেশ থেকে প্রায় ৫০০টির ও বেশি এনজিও আবেদন করে। কার্যক্রমটি জুলাই ২০২৫ থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও মাঠ পর্যায়ে নানা অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত শেষে প্রকল্পটি স্থগিত রাখা হয়।
পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট কার্যক্রম শুরু হলে নির্বাচন কমিশন থেকে ভিডব্লিউবি, এমসিবিসহ সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপসচিব মো. মনির হোসেন গত ২৩ ডিসেম্বর মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে পাঠানো এক চিঠিতে কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা উপেক্ষা করে শেষ কর্মদিবসে ২৪৮টি এনজিওকে অনুমোদন দেয়ার ঘটনায় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনকালীন সংবেদনশীল সময়ে এত বড় অঙ্কের প্রকল্পে তড়িঘড়ি অনুমোদন প্রশাসনিক বিধিবিধান ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া অনুদোদিত প্রকল্পে যেসব এনজিওকে নির্বাচিত করা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই নামসর্বস্ব ও অস্তিত্বহীন। এদের অনেকেরই অফিস নেই, কার্যক্রম নেই। কোনো কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক এনজিও পরিচালনারও অভিযোগ রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক এদিনকে বলেন, স্থগিত থাকা একটি প্রকল্প শেষ কর্মদিবসে অনুমোদন দেয়া অস্বাভাবিক। এতে সিদ্ধান্তের পেছনে অন্য কোনো প্রভাব বা চাপ ছিল কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন কমিশনের স্থগিতাদেশ বহাল থাকা অবস্থায় প্রকল্প অনুমোদন প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও আইনগত কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পাশাপাশি অদক্ষ বা পক্ষপাতমূলক নির্বাচন হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও তাঁরা মত দেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









