ইসলামপন্থী দলগুলোর ভোট এক ছাতার নিচে আনতে প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে একসঙ্গে কাজ করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (আইএবি)। নির্বাচনের ঠিক আগে আসন ভাগাভাগি নিয়ে দুই দলের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই সমঝোতা টিকবে কি না, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়। তবে এই জোট থেকে কোন দল বের হয়ে যায়নি। এমনকি জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে এখনও কোন দল চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে জামায়াতসহ জোটের নেতারা বলছেন, আসন সমঝোতা নিয়ে ইসলামপন্থীদের জোটে কোন সংকট নেই। শিগগির জোটের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হবে। ইসলামপন্থী দলগুলোর ভোট একবাক্সেই থাকবে।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে কোন সংকট নেই। ইসলামপন্থীদের জোটে আসন বন্টনসহ সবকিছুই ঠিকঠাক আছে। জোটের প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত। শিগগির ৩০০ আসনে জোটের প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। যেখানে একাধিক প্রার্থী আছে, সেখানে জোটের সিদ্ধন্ত মেনে অন্যরা প্রার্থীতা প্রত্যাহার করবে।
জোটের নেতা–কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জামায়াত নিজের জন্য ১৮০ থেকে ১৮৫টি আসন রাখতে চায়। বাকি আসনগুলো জোটের শরিকদের মধ্যে বণ্টনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই হিসাবে জামায়াতের পর সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার কথা ইসলামী আন্দোলনের, এরপর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)। তবে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন এই প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নয়। দলটির দাবি, তাদের আরও বেশি আসন পাওয়া উচিত। বিশেষ করে সদ্য গঠিত এনসিপিকে ৩০টি আসন দেওয়ার সিদ্ধান্তে তারা ক্ষুব্ধ। তাদের মতে, এনসিপিকে অযথা অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের অবস্থানও ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে মিলে গেছে।
শুরুতে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ মোট আটটি দল আসন ভাগাভাগির আলোচনায় ছিল। তবে মনোনয়নপত্র জমার শেষ তারিখের একদিন আগে ২৮ ডিসেম্বর, এনসিপি এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) জোটে যোগ দেয়। ওই রাতেই আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) যুক্ত হওয়ার খবর আসে। এতে জোটের শরিক দলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১টিতে।
ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শীর্ষ নেতারা জানান, এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টিকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের মতামত যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি। তাদের অভিযোগ, জামায়াতের একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণই বর্তমান অসন্তোষের মূল কারণ। তবে উত্তেজনার মধ্যেও ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম মনে করেন, ১১ দল নিয়ে আসন ভাগাভাগি ঘিরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা সমাধানযোগ্য। তিনি বলেন, জোট গঠনের জন্য আন্তরিকতা দরকার। পারস্পরিক সম্মান ও সদিচ্ছা থাকতে হবে। একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। কেউ যদি মনে করে—আমি খুব বড়, তুমি খুব ছোট—তাহলে একসঙ্গে পথ চলা সম্ভব নয়। জামায়াতকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, দলগুলোর মধ্যে সমতা থাকতে হবে। সব সিদ্ধান্ত আলোচনা করে নিতে হবে। তা হলে কেউ প্রশ্ন তুলবে না, কেউ বিভ্রান্তও হবে না।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদও একই সুরে বলেন, আমি একে সংকট মনে করি না। আসন ভাগাভাগি হলে প্রত্যেক দলকে তাদের অবস্থান অনুযায়ী ন্যায্য অংশ পেতে হবে। তা হলে কোনো সংকট বা জটিলতা থাকবে না।
অন্যদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, এখানে কোনো সংকট নেই। বিভিন্ন দল ভিন্ন ভিন্ন সময়ে জোটে যোগ দেওয়ায় প্রক্রিয়াটি একটু সময় নিচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২৮ ডিসেম্বর ১১ শরিক দলের মধ্যে সর্বশেষ দফার আলোচনা হয়। ওই দিন জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান জানান, এনসিপি ও এলডিপি একযোগে আন্দোলনের অংশ হিসেবে জোটে যুক্ত হয়েছে। পরে এবি পার্টির যুক্ত হওয়ার খবর আসে। সূত্র অনুযায়ী, সর্বশেষ প্রস্তাবে জামায়াত ইসলামী আন্দোলনকে ৪০টি, এনসিপিকে ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১১টি, খেলাফত মজলিসকে তিনটি, এবি পার্টিকে তিনটি, এলডিপিকে দুটি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টিকে (জাগপা) তিনটি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টিকে (বিডিপি) দুটি আসন দেওয়ার কথা বলেছে।
তবে চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়ায় ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিনে জামায়াত ২৭৬টি আসনে প্রার্থী দেয়। ইসলামী আন্দোলন প্রার্থী দেয় ২৬৮টি আসনে। এনসিপি ৪৪টি, এবি পার্টি ৫৩টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি এবং খেলাফত মজলিস ৬৮টি আসনে মনোনয়ন জমা দেয়।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য ও জামায়াত–ইসলামী আন্দোলন সূত্রে জানা গেছে, যে আসনগুলো ইসলামী আন্দোলনের জন্য ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল, সেখানেও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াত প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। একইভাবে, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরাও জামায়াতের জন্য নির্ধারিত আসনগুলোতে মনোনয়ন দিয়েছেন। জামায়াত যে ২৪টি আসনে প্রার্থী দেয়নি, তার বেশির ভাগই এনসিপির জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জামায়াত ঢাকা–১৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক এবং কিশোরগঞ্জ–৬ আসনে দলটির যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমীনের জন্য প্রার্থী প্রত্যাহার করেছে।
অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলনও যেসব আসন তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল, সেখানে প্রার্থী রেখেছে।
চরমোনাই পীরের ভাই ও দলের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম বরিশাল–৫ ও বরিশাল–৬ আসনে মনোনয়ন দিয়েছেন, যেখানে জামায়াতের প্রার্থীরাও আছেন। এ ছাড়া বরিশাল–৪ থেকে সৈয়দ ইসহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের এবং ঢাকা–৪ থেকে মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল-মাদানীও মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। এই তিনটির মধ্যে দুটি আসন জামায়াত ছেড়ে দেওয়ার কথা থাকলেও তারা সবগুলোতেই প্রার্থী দিয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব ইউনুস আহমদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন খুলনা–৪ আসনে।
দলীয় সূত্র জানায়, শুরুতে ইসলামী আন্দোলন ১৫০টি আসন দাবি করেছিল। পরে তা কমিয়ে ১২০-এ আনা হয়। বর্তমানে দলটি ৭০টির বেশি আসন চাইছে এবং মাত্র ৪০টি আসনে রাজি নয়। ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম বলেন, আসন নিয়ে সমঝোতা অসম্ভব নয়। উভয় পক্ষের সদিচ্ছা থাকলে, যদি সবাই সত্যিই ইসলামকে ক্ষমতায় আনতে চায় এবং কেউ এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন না দেখে, তবে এটি কোনো সমস্যাই নয়।
সমঝোতা কবে চূড়ান্ত হতে পারে—এ প্রশ্নে জামায়াতের প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, গতকাল রোববার মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষ হলো। আমরা আশা করছি, এই সপ্তাহের মধ্যেই সমঝোতা চূড়ান্ত করে ঘোষণা দিতে পারব। তবে ২০ ডিসেম্বরের আগেই জোটপ্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
একই আশাবাদ প্রকাশ করে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, আমরা একটি জোট। জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। জোট অটুট রাখতে প্রয়োজনে ছাড় দিতে আমরা প্রস্তুত।
ফয়জুল করিম বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এখনো জোট ভাঙেনি। কেউ বহিষ্কৃত হয়নি, কেউ বেরিয়েও যায়নি। আমরা সবাইকে নিয়ে এগোতে চাই। কিন্তু যদি কেউ মনে করে একাই ক্ষমতায় যাবে, তবে সামনে এগোনো সম্ভব হবে না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









