ফুটবল বিশ্বকাপের মৌসুম এসে গেছে। আগামী ১ মাসজুড়ে বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের চোখ থাকবে মাঠের দিকে, যেখানে গ্রহের সেরা ফুটবলাররা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে নামবেন। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি আবেগ, নাটকীয়তা ও ইতিহাস রচনার মঞ্চ। আর যারা এখনো ফুটবলের সঙ্গে খুব বেশি পরিচিত নন, তাদের জন্যও এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটির প্রেমে পড়ার এক সুবর্ণ সুযোগ। বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি এমন এক আয়োজন, যেখানে খেলাধুলা, সংস্কৃতি, জাতীয় গর্ব এবং মানবিক আবেগ এক সুতোয় গাঁথা হয়ে যায়। ২০২৬ সালের আসরটি আবারো বিশেষ, কারণ এবারই প্রথমবারের মতো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

ফুটবলের মৌলিক নিয়ম
ফুটবল খেলায় প্রতিটি দলে মাঠে থাকে ১১ জন করে খেলোয়াড়। ম্যাচ চলাকালে একজন কোচ সর্বোচ্চ পাঁচটি পরিবর্তন করতে পারেন, যা কৌশলগত পরিবর্তন কিংবা ক্লান্ত খেলোয়াড়দের বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করা হয়। একটি ম্যাচের দৈর্ঘ্য ৯০ মিনিট, যা দুটি ৪৫ মিনিটের অর্ধে বিভক্ত। জয়ের জন্য একটি দল পায় তিন পয়েন্ট, ড্র করলে উভয় দল পায় এক পয়েন্ট করে এবং পরাজিত দল কোনো পয়েন্ট পায় না। নিয়মের দিক থেকে ফুটবল খুবই সহজ একটি খেলা।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ
২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে মোট ৪৮টি দল, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। দলগুলোকে ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে এবং প্রতিটি গ্রুপে রয়েছে চারটি করে দল। গ্রুপপর্বে প্রতিটি দল নিজেদের গ্রুপের অন্য তিন দলের বিপক্ষে একটি করে ম্যাচ খেলবে। ফলে প্রতিটি দল কমপক্ষে তিনটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবে। গ্রুপের পয়েন্ট তালিকার ভিত্তিতে শীর্ষ দুই দল সরাসরি নকআউট পর্বে জায়গা করে নেবে। এছাড়া ১২টি গ্রুপের মধ্যে সেরা আটটি তৃতীয়-স্থান অর্জনকারী দলও পরবর্তী পর্বে উঠবে।
অর্থাৎ গ্রুপপর্ব শেষে মোট ৩২টি দল নকআউট রাউন্ডে খেলবে। নতুন এই ফরম্যাটের ফলে দলগুলোর জন্য পরবর্তী রাউন্ডে ওঠার সুযোগ আগের চেয়ে অনেক বেশি।

নকআউট পর্বের রোমাঞ্চ
নকআউট পর্ব শুরু হবে রাউন্ড অব ৩২ দিয়ে। এরপর ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হবে রাউন্ড অব ১৬, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল। এছাড়া সেমিফাইনালে হেরে যাওয়া দুই দলকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ।
নকআউট ম্যাচে ড্রয়ের সুযোগ নেই। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে স্কোর সমান থাকলে খেলা গড়াবে অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের দৈর্ঘ্য ৩০ মিনিট, যা দুটি ১৫ মিনিটের ভাগে বিভক্ত। সেখানেও যদি কোনো দল বিজয়ী হতে না পারে, তবে ম্যাচের নিষ্পত্তি হবে পেনাল্টি শুটআউটে। প্রথমে উভয় দল পাঁচটি করে শট নেবে। এরপরও সমতা থাকলে শুরু হবে ‘সাডেন ডেথ’, যেখানে একটি ভুল কিংবা একটি গোলই নির্ধারণ করে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তের অনেকগুলোই এসেছে এই পেনাল্টি শুটআউট থেকে।

কারা হতে পারে চ্যাম্পিয়ন?
বি বর্তমান সময়ে সম্ভাব্য শিরোপাপ্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড এবং পর্তুগাল। তবে বিশ্বকাপের সৌন্দর্যই হলো এর অনিশ্চয়তা। প্রায় প্রতিটি আসরেই দেখা যায় কোনো বড় দল প্রত্যাশার আগেই বিদায় নেয়, আবার অপেক্ষাকৃত ছোট কোনো দল অবিশ্বাস্য যাত্রা করে পৌঁছে যায় শেষের দিকে। এই অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলোই বিশ্বকাপকে অন্য যে কোনো টুর্নামেন্ট থেকে আলাদা করে।

ফুটবলের জন্ম কোথায়?
ফুটবলের প্রকৃত জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতায় বল নিয়ে নানা ধরনের খেলা প্রচলিত ছিল। এর মধ্যে চীনের ‘কুজু’ (Cuju) অন্যতম পরিচিত উদাহরণ। তবে আধুনিক ফুটবলের নিয়ম-কানুন গড়ে ওঠে উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, আধুনিক ফুটবলের জন্ম হয় লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ডে অবস্থিত ফ্রিম্যাসনস ট্যাভার্ন নামের একটি স্থানে। ১৮৬৩ সালের ২৬ অক্টোবর সেখানে ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে খেলাটির নিয়ম চূড়ান্ত করা হয়।
আজও ভবনটির বাইরে একটি স্মারক ফলক রয়েছে, যেখানে লেখা আছে যে সেদিনই আধুনিক ফুটবলের জন্ম হয়েছিল। তবে অনেক গবেষক আবার স্কটল্যান্ডকেও আধুনিক ফুটবলের অন্যতম জন্মস্থান হিসেবে দাবি করেন। ফলে বিষয়টি এখনো বিতর্কিত।
ফুটবল ইতিহাসবিদ ম্যাথিউ টেইলরের ভাষায়, আধুনিক ফুটবলের উদ্ভব কোনো একক ব্যক্তি বা স্থানের কৃতিত্ব নয়; বরং এটি বিভিন্ন মানুষ, অঞ্চল ও সংস্কৃতির যৌথ অবদানের ফল।

কীভাবে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল ফুটবল?
ফুটবলের বিশ্বব্যাপী বিস্তারের পেছনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ব্রিটিশ নাবিক, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ফুটবল নিয়ে যান। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, শুধু ব্রিটিশ প্রভাবই এর একমাত্র কারণ নয়।
ফুটবল ছিল আধুনিকতা, আন্তর্জাতিকতা এবং নতুন সামাজিক পরিচয়ের প্রতীক। একটি ফুটবল ক্লাব গড়ে তোলা মানে ছিল আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করা।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল খেলাটির সরলতা। একটি বল এবং কিছু খেলোয়াড় থাকলেই ফুটবল খেলা সম্ভব। সহজ নিয়ম, কম খরচ এবং অসাধারণ বিনোদনমূলক চরিত্রের কারণে ফুটবল দ্রুত বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলায় পরিণত হয়।
ফিফা ও আধুনিক ফুটবলের শক্তি
বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলো ফিফা। বিশ্বকাপ আয়োজন থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ফুটবলের বিস্তার সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু এই সংস্থাটি।
আজকের ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়; এটি বহু বিলিয়ন ডলারের শিল্প। এর অর্থনৈতিক প্রভাব যেমন বিশাল, তেমনি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও কম নয়। তবুও খেলাটির মূল সৌন্দর্য অপরিবর্তিত রয়েছে। শেষ পর্যন্ত এটি এখনও ২২ জন খেলোয়াড়ের একটি বল নিয়ে প্রতিপক্ষের জালে গোল করার লড়াই।
সামনে অপেক্ষা ১০৪ ম্যাচের মহাযজ্ঞ
বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হবে ১১ জুন, স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে। প্রায় এক মাসের লড়াই শেষে ১৯ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল। মোট ১০৪টি ম্যাচের এই মহাযজ্ঞে ফুটবলপ্রেমীরা পাবেন নাটকীয়তা, আবেগ, বিস্ময়, বীরত্বগাথা এবং নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ।
যারা এখনো ফুটবলের জগতে নতুন, তাদের জন্য এটিই হতে পারে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটিকে নতুনভাবে আবিষ্কারের সেরা সময়। আর যারা বহুদিনের সমর্থক, তাদের জন্য বিশ্বকাপ মানেই আবারো স্বপ্ন দেখা, হতাশা, উল্লাস এবং শেষ পর্যন্ত এক নতুন চ্যাম্পিয়নের জন্ম দেখা।
বিশ্লেষক- ইসলামুল হাফিজ নির্জন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









