কখনও কখনও কিছু গল্প এতই অসাধারণ হয় যে সেগুলোকে কাল্পনিক বলে মনে হয়। কিন্তু যখন সেই গল্পটি লুকা মোদ্রিচের, তখন বাস্তবতাই কাল্পনিকতাকে হার মানায়। ছয় বছর বয়সে যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখা এক শিশু, যার দাদাকে হত্যা করা হয়েছিল সামনেই, যার পরিবারকে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে হয়েছিল — সেই শিশুটি একদিন বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে দাঁড়াবে, এমন কল্পনাও কেউ করেনি। কিন্তু মোদ্রিচ করেছেন। শুধু করেছেন তা-ই নয়, তিনি প্রমাণ করেছেন যে মানুষের সাহসের কোনো সীমা নেই।
পূর্তগালের বিপক্ষে তিনি ক্রোয়েশিয়ার জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামছেন, তখন আমাদের জন্য এটি শুধু একজন খেলোয়াড়ের বিদায় নয় — এটি এক যুগের সমাপ্তি, এক কিংবদন্তির প্রস্থান।
যুদ্ধ শিশু: শৈশবের কালো ছায়া
১৯৮৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ক্রোয়েশিয়ার জাদার শহরে জন্ম নেওয়া লুকা মোদ্রিচের শৈশব ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ১৯৯১ সালে, যখন তিনি মাত্র ছয় বছর বয়সী, তখন ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। সেই যুদ্ধে মদ্রিচের দাদা লুকা মদ্রিচ সিনিয়রকে সার্বীয় বাহিনী হত্যা করে। ছোট্ট লুকা চোখের সামনেই সেই ভয়াবহতা দেখেছিলেন।
পরিবারকে তাদের গ্রামের বাড়ি ছেড়ে জাদার শহরের কলোভারে হোটেলে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। সাত বছর ধরে সেই হোটেলেই কেটেছিল তাদের জীবন — বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই, প্রতিদিন গোলাগুলির শব্দ। কিন্তু সেই হোটেলের ফাঁকা পার্কিং লটেই লুকা প্রথম ফুটবলের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলেন। বোমার শব্দের মধ্যেও তিনি বল নিয়ে খেলতেন। তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলবার্ট রাদোভনিকোভিচ বলেছিলেন, "লুকা অসাধারণ বিনয়ী ছিল। আমি তাকে বলতাম পড়াশোনা করতে, সে বলত, 'আরেকটু খেলি, স্যার।'"
অসম্ভবকে সম্ভব করা: ফুটবল যাত্রার শুরু
মদ্রিচের শারীরিক গঠন ছিল নিয়তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক। মাত্র ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতা, হাড়জিরজিরে শরীর — অনেকেই তাকে প্রফেশনাল ফুটবলের উপযুক্ত মনে করেননি। আট বছর বয়সে তিনি তার স্বপ্নের ক্লাব হাজদুক স্প্লিটের ট্রায়ালে ব্যর্থ হন, কারণ তাকে "খুব ছোট এবং দুর্বল" বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।
কিন্তু মদ্রিচ হাল ছাড়েননি। তিনি স্থানীয় ক্লাব এনকে জাদারে যোগ দেন, যেখানে হোটেল কলোভারের মালিক ছিলেন ক্লাবের ম্যানেজার। সেখান থেকে ২০০২ সালে, ১৬ বছর বয়সে, তিনি ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্লাব দিনামো জাগরেবে নাম লেখান। কিন্তু প্রথমে তাকে ধারে পাঠানো হয় বসনিয়ার জ্রিনিস্কি মোস্তারে, যেখানে তিনি ২০০৩ সালে বসনিয়ান প্রিমিয়ার লিগের বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। এরপর ইন্টার জাপ্রেসিচে সাথে খেলে তিনি দলকে লিগের দ্বিতীয় স্থানে নিয়ে যান।
২০০৫ সালে দিনামো জাগরেবে ফিরে আসেন এবং ১০ বছরের চুক্তি সই করেন। তিন মৌসুমে ১১৮ ম্যাচে ৩২ গোল করে তিনি দুটি ক্রোয়েশিয়ান কাপ জিততে সাহায্য করেন।
ইউরোপের মঞ্চ: টটেনহ্যাম থেকে রিয়াল মাদ্রিদ
২০০৮ সালে মদ্রিচ ইংল্যান্ডের টটেনহ্যাম হটস্পারে ১৫.৮ মিলিয়ন পাউন্ডে যোগ দেন। চার মৌসুমে ১৬০ ম্যাচে ১৭ গোল করে তিনি ক্লাবকে প্রায় ৫০ বছর পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগে উঠতে সাহায্য করেন।
২০১২ সালে, প্রায় ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে তিনি রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন। স্প্যানিশ মিডিয়া প্রথমে তাকে "রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সাইনিং" বলেছিল। কিন্তু জোসে মরিনহো বলেছিলেন, "যখন আমি তাকে রিয়ালে নিয়ে আসি, স্প্যানিশ প্রেস বলেছিল এটি রিয়ালের ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সাইনিং। কথা হল সে কিন্তু সবচেয়ে খারাপ নয় — সে অন্যতম সেরা।"
রিয়াল মাদ্রিদের স্বর্ণযুগ: ২৮টি ট্রফির মালিক
রিয়াল মাদ্রিদে ১৩ মৌসুমে মদ্রিচ ৫৯৭ ম্যাচ খেলে ৪৩ গোল করেন এবং ২৮টি ট্রফি জিতেন — ক্লাব ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ট্রফি জয়ী খেলোয়াড়। এর মধ্যে ছিল ছয়টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ (২০১৪, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮, ২০২২, ২০২৪), চারটি লা লিগা, দুটি কোপা দেল রে এবং পাঁচটি স্প্যানিশ সুপার কাপ।
তিনি কেসেমিরো এবং ক্রোসের সঙ্গে গড়েছিলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ড ট্রিও। ২০১৮ সালে তিনি ব্যালন ডি'অর জিতে মেসি-রোনালদোর এক দশকের আধিপত্য ভেঙে দেন — ক্রোয়েশিয়ার প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এই সম্মান অর্জন করেন। একই বছর তিনি ফিফার বর্ষসেরা পুরুষ খেলোয়াড় এবং উয়েফার বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জিতেন।
ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক: জাতীয় দলের স্বপ্নযাত্রা
২০০৬ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৩-২ জয়ে আন্তর্জাতিক অভিষেক হওয়া মদ্রিচ ২০১৫ সালে প্রথমবার ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়কত্ব করেন
২০১৮ বিশ্বকাপ — স্বপ্নিল স্বপ্ন: রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে মোদ্রিচ ক্রোয়েশিয়াকে প্রথমবারের মতো ফাইনালে নিয়ে যান। ডেনমার্ক, রাশিয়া এবং ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠা ক্রোয়েশিয়া শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের কাছে ৪-২ গোলে হারে। কিন্তু মদ্রিচ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জিতেন।
২০২২ বিশ্বকাপ — ব্রোঞ্জের গৌরব: কাতার বিশ্বকাপে তিনি ক্রোয়েশিয়াকে আবার সেমিফাইনালে নিয়ে যান। আর্জেন্টিনার কাছে হারলেও মরক্কোকে হারিয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করে ক্রোয়েশিয়া। মোদ্রিচ ব্রোঞ্জ বল জিতেন।
ইউরো ২০২৪ — ইতিহাস: ৩৮ বছর ২৮৯ দিন বয়সে ইতালির বিপক্ষে গোল করে তিনি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের
ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতা
২০২৬ বিশ্বকাপ — শেষ যাত্রা: ২০২৬ সালের মে মাসে তিনি পঞ্চম বিশ্বকাপের জন্য দলে নির্বাচিত হন। ২৩ জুন পানামার বিপক্ষে ১-০ জয়ে তিনি ক্রোয়েশিয়ার হয়ে ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন — ইউরোপের চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে এই মাইলফলক স্পর্শ করেন। ২৭ জুন ঘানার বিপক্ষে ২-১ জয়ে তিনি ৪০ বছর ২৯১ দিন বয়সে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতা হন।
এসি মিলান: শৈশবের স্বপ্ন পূরণ
২০২৫ সালের আগস্টে, ৩৯ বছর ১১ মাস বয়সে, মোদ্রিচ ফ্রি ট্রান্সফারে এসি মিলানে যোগ দেন — যা ছিল তার শৈশবের স্বপ্ন। তিনি সিরি আ'তে অভিষেকের সময় সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হন। বলোনিয়ার বিপক্ষে তার প্রথম গোলে মিলান ১-০ জয় পায়। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলে জুভেন্টাসের বিপক্ষে ম্যাচে চোটের কারণে তার মৌসুম শেষ হয়ে যায়।
ব্যক্তিগত জীবন: বিনয়ী মহানায়ক
মদ্রিচ তার প্রথম পেশাদার বেতন দিয়ে প্রথম যে জিনিস কিনেছিলেন তা ছিল তার মা-বাবার জন্য একটি বাড়ি — যুদ্ধের সময় হারানো ঘরের প্রতিস্থান। তিনি বর্তমানে স্ত্রী ভনিয়া এবং তিন সন্তান — ইভান, এমা এবং সোফিয়ার সঙ্গে থাকেন।
তিনি রেকর্ড ১১বার ক্রোয়েশিয়ার বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন। ফিফা ফিফপ্রো ওয়ার্ল্ড XI-তে ছয়বার জায়গা পেয়েছেন।
এক কিংবদন্তির বিদায়
লুকা মদ্রিচের গল্প শুধু ফুটবলের গল্প নয় — এটি একজন মানুষের সাহস, অধ্যবসায় এবং স্বপ্নের গল্প। যুদ্ধের শিশু থেকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, শরণার্থী শিবিরের পার্কিং লট থেকে বার্নাব্যুর মাঠ — এই যাত্রা কেবল একজন খেলোয়াড়ের নয়, একজন যোদ্ধার।
যখন তিনি মাঠ থেকে বিদায় নিচ্ছেন, তখন তিনি শুধু ক্রোয়েশিয়ার নয়, সমগ্র ফুটবল বিশ্বের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। তার ছোট্ট শরীরে যে বিশাল হৃদয়, তার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
বিদায়, লুকা। তুমি শুধু একজন কিংবদন্তি নও — তুমি এক যুগ, এক স্বপ্ন, এক অসাধারণ গল্প। যা অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে ফুটবলের ইতিহাসে চিরদিন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









