বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রাক্কালে স্প্যানিশ কোচের দর্শন ও দল গঠনের নেপথ্যে বার্সেলোনার তরুণ বিষ্ময় লামিন ইয়ামালের পোস্টারে ছেয়ে গেছে গোটা স্পেন। কিন্তু আসল নায়ক কি শুধুই তিনি? নাকি ডাগআউটে বসে থাকা ৬৫ বছর বয়সী এক কোচ, যিনি গত দুই বছর ধরে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি ধরে রেখেছেন এবং এখন বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন পুরো জাতিকে?
লুইস দে লা ফুয়েন্তের ছত্রছায়ায় স্পেন এখন বিশ্বসেরা হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। বিশ্বকাপ ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ একসাথে জয়ের স্বপ্নে বিভোর তারা। ইতিহাসে মাত্র তিনটি দল এই কীর্তি গড়েছে—২০১০ সালের স্পেন, ২০০০ সালের ফ্রান্স এবং ১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানি। শুক্রবার বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনাল। জয়ী দলের সামনে অপেক্ষা করছে ফ্রান্স।
২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে দলের দায়িত্ব নিয়ে দে লা ফুয়েন্তে মাত্র তিনটি ম্যাচ হেরেছেন। বর্তমানে তিনি ৩৫ ম্যাচ অপরাজিত। কিন্তু পরিসংখ্যান তার সফলতার গভীরতা বোঝায় না। কেউ কেউ কোচ হয়ে তাকটিক দিয়ে দল গড়েন, কেউ মানুষকে বুঝে। দে লা ফুয়েন্তে উভয়ই করেন—এবং তার চেয়েও বেশি কিছু।
"ফুটবল দলগত খেলা, ভালো মানুষ দিয়ে গড়া"
দে লা ফুয়েন্তের দর্শনের কেন্দ্রে একটি সরল বিশ্বাস—ফুটবল দলগত খেলা, যা ভালো মানুষ গড়া। শুধু নৈতিক অর্থে নয়, ফুটবলীয় অর্থে—উদার, সহায়ক, আত্মত্যাগী, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং দলের জন্য সবকিছু উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। বেলজিয়াম ম্যাচের আগে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "যারা ড্রেসিং রুমে থেকেছেন, তারা জানেন ভালো মানুষ হওয়ার অর্থ। প্রতিটি দলেই থাকে উল্টোটা—যে নিজেকে প্রথমে রাখে, দলের সম্প্রীতি নষ্ট করে।"
তিনি জানেন, প্রতিভা ছাড়া উদারতা দূরে নিয়ে যায় না। তার স্পেন এমন খেলোয়াড় দিয়ে গড়া, যারা নেওয়ার আগে দেয়।
"বিশ্লেষণ করা সহজ, হারানো কঠিন"
বিশ্বকাপে টিকে থাকা প্রতিটি দলের একটি মিল আছে—স্পষ্ট ধারণা। জাতীয় দলের কাছে ক্লাবের মতো সময় থাকে না। তাই বার্তা সরল হতে হবে এবং পুনরাবৃত্ত হতে হয়। এখানেই স্পেনের সুবিধা। তাদের ফুটবলীয় পরিচয় দশকের পর দশক ধরে গড়ে উঠেছে। খেলোয়াড় ও কোচ নির্বাচিত হন এই ধারণার সাথে মানানসইভাবে, উল্টোটা নয়। পেপ গার্দিওলা একবার জোহান ক্রুইফকে নিয়ে যা বলেছিলেন, দে লা ফুয়েন্তের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য—"তিনি ক্যাথিড্রাল তৈরি করেননি, তিনি শুধু সময়ে সময়ে রং করেন।"
তার যোগ করেছেন বহুমুখিতা, গভীরতা, ট্রানজিশনে আরাম, আক্রমণভাগের অপ্রত্যাশিততা এবং শক্তি। পর্তুগালের এক স্টাফ ম্যাচ শেষে বলেছিলেন, "বিশ্লেষণ করা সবচেয়ে সহজ দল, কিন্তু হারানো সবচেয়ে কঠিন।"
লামিন ইয়ামালের মুহূর্ত
প্রতিভাবান লামিনকে সামলানো দে লা ফুয়েন্তের সবচেয়ে নাজুক কাজ। তিনি বলেন, "শান্ত থেকে আত্মবিশ্বাস দেওয়া। আমরা জানি লামিন কোথা থেকে এসেছেন—দুই মাসের ইনজুরি। ফিটনেসে পুরোপুরি না থাকলেও, এই পর্যায়ের জন্য আমাদের পরিকল্পনা ছিল।"
তার কাছে পর্তুগাল ম্যাচ ছিল লামিনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বল দিয়ে নয়, বল ছাড়া অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য। "এটা তার মুহূর্ত। দশ গোল করার নয়, নির্ণায়ক ম্যাচে নির্ণায়ক হওয়ার।" মিকেল ওয়ারিয়াবালেরও প্রশংসা করেছেন। "তিনি বিশ্বের সেরা পাঁচ সেন্টার ফরোয়ার্ডের একজন। ভিন্ন পরিস্থিতিতে অনেক আগেই স্বীকৃতি পেতেন।"
দে লা ফুয়েন্তের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা। নিজেও প্রতিদিন ফিট থাকতে অনুশীলন করেন। "এটা জীবনধারা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা। বন্ধুরা বলতো আমি ক্লান্তিকর। একবার মনস্থির করলে, থেমে থাকি না।"
এখন তার মনে একটাই বিষয়—বিশ্বকাপ। লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন: সংস্কৃতি, ধারাবাহিকতা এবং লামিন ইয়ামাল
বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রাক্কালে স্প্যানিশ কোচের দর্শন ও দল গঠনের নেপথ্যে বার্সেলোনার তরুণ বিস্ময় লামিন ইয়ামালের পোস্টারে ছেয়ে গেছে গোটা স্পেন। কিন্তু এই দলের আসল নায়ক কি শুধুই তিনি? নাকি ডাগআউটে বসে থাকা ৬৫ বছর বয়সী এক কোচ, যিনি গত দুই বছর ধরে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি ধরে রেখেছেন এবং এখন বিশ্বকাপ চাই তার।
সূত্র: গুইলেম বালাগুয়ে,স্প্যানিশ ফুটবল জার্নালিস্ট, বিবিসি


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









