আটলান্টার মাঠে বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে আবারও মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফুটবলের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। তবে এই লড়াই শুধু একটি ম্যাচ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ছয় দশকের উত্তেজনা, রাজনৈতিক পটভূমি এবং বিশ্বকাপের অসংখ্য স্মরণীয় ঘটনা।
এই প্রথম ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি। দুই দলের বিশ্বকাপ ইতিহাস শুরু ১৯৬২ সালে। এখন পর্যন্ত পাঁচবার বিশ্বকাপে দেখা হয়েছে তাদের। পরিসংখ্যানে ইংল্যান্ড এগিয়ে থাকলেও, দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বড় জয়ের অপেক্ষায় রয়েছে তারা।
১৯৬২: প্রথম সাক্ষাতে ইংল্যান্ডের জয়
চিলির রাংকাগুয়ায় প্রথমবার বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। রন ফ্লাওয়ার্স, ববি চার্লটন ও জিমি গ্রিভসের গোলে ইংল্যান্ড ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। পরে আর্জেন্টিনা একটি গোল করলেও ম্যাচের ফল বদলাতে পারেনি।
গ্রুপ পর্বে দুই দল সমান পয়েন্ট পেলেও গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে কোয়ার্টার ফাইনালে যায় ইংল্যান্ড। তবে শেষ আটে ব্রাজিলের কাছে হেরে বিদায় নেয় তারা।
১৯৬৬: বিতর্কিত ম্যাচে জন্ম নেয় তিক্ততা
ওয়েম্বলিতে ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি দুই দলের দ্বৈরথের অন্যতম বড় অধ্যায় হয়ে আছে। ইংল্যান্ডের জেফ হার্স্টের গোল নিয়ে আর্জেন্টিনার আপত্তি থাকলেও সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনের লাল কার্ড ঘিরে।
৩৩তম মিনিটে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান রাত্তিন। প্রায় আট মিনিট খেলা বন্ধ থাকে। পরে ইংল্যান্ড কোচ অ্যালফ র্যামসি আর্জেন্টিনা দলকে ‘পশু’ বলে মন্তব্য করেন এবং খেলোয়াড়দের জার্সি বিনিময় না করার নির্দেশ দেন।
এই ম্যাচের পরই ১৯৭০ বিশ্বকাপে লাল ও হলুদ কার্ড ব্যবস্থার প্রচলন করা হয়।
১৯৮৬: মারাদোনার ‘ঈশ্বরের হাত’ ও অবিশ্বাস্য গোল
মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনাল ছিল শুধু ফুটবল নয়, ফকল্যান্ডস যুদ্ধের পর দুই দেশের আবেগ ও রাজনৈতিক উত্তেজনারও প্রতিফলন।
ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত আসে ডিয়েগো মারাদোনার হাত দিয়ে করা গোলের মাধ্যমে। গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সঙ্গে লাফিয়ে উঠে হাত দিয়ে বল জালে পাঠান মারাদোনা। ভিএআর না থাকায় গোলটি বাতিল হয়নি।
কিন্তু এর কয়েক মিনিট পরই মারাদোনা করেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল। ইংল্যান্ডের একাধিক খেলোয়াড়কে কাটিয়ে সেই গোল আজও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে কিংবদন্তি হয়ে আছে।
গ্যারি লিনেকার একটি গোল শোধ করলেও ইংল্যান্ডকে বিদায় নিতে হয়। পরে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা।
১৯৯৮: বেকহামের লাল কার্ডের ম্যাচ
ফ্রান্স বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে আবারও মুখোমুখি হয় দুই দল। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা ও অ্যালান শিয়ারের পেনাল্টির পর মাইকেল ওভেন দুর্দান্ত এক গোলে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন। বিরতির আগে জাভিয়ের জানেত্তি সমতা ফেরান।
দ্বিতীয়ার্ধে ডেভিড বেকহাম আর্জেন্টিনার ডিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মারায় সরাসরি লাল কার্ড দেখেন। দশজনের ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায়। টাইব্রেকারে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।
পরে সিমিওনে স্বীকার করেন, ওই ঘটনায় রেফারি হয়তো পরিস্থিতির চাপে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
২০২৬: মেসির প্রথম ইংল্যান্ড পরীক্ষা
২০০২ সালের পর আবার বিশ্বকাপ মঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। এবার ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেল, আর আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
ইংল্যান্ড এখনো ৬০ বছর ধরে বিশ্বকাপ শিরোপার অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ফকল্যান্ডস যুদ্ধের স্মৃতি এখনো দুই দেশের সমর্থকদের আবেগে প্রভাব ফেলে।
আটলান্টার এই ম্যাচ তাই শুধুই একটি সেমিফাইনাল নয় এটি ছয় দশকের ইতিহাস, বিতর্ক, আবেগ ও কিংবদন্তির আরেকটি নতুন অধ্যায়।
সূত্র: বিবিসি স্পোর্টস


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









