বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে আর মাত্র একটি ম্যাচের দূরত্ব। একদিকে বর্তমান ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেন, অন্যদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। এই মহারণের আগে স্পেন অধিনায়ক রদ্রিগো হার্নান্দেজ ক্যাসকান্তে কথা বলেছেন স্প্যানিশ দৈনিক এএস-এর সঙ্গে। কথায় কথায় উঠে এসেছে তার দীর্ঘ পথচলা, চোট কাটিয়ে ফিরে আসার গল্প, লিওনেল মেসিকে ঘিরে পরিকল্পনা এবং বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। শান্ত, পরিমিত ও আত্মবিশ্বাসী রদ্রির কণ্ঠে বারবার ফিরে এসেছে একটি বার্তা—ভয় নয়, সাহসই হবে স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
মেলবোর্নে স্পেন দলের অনুশীলনে বসে রদ্রি বলেন, ‘আমি ছেলেদের বলেছি, হারার ভয় যতটা, তার চেয়ে বেশি করে আমাদের জিততে চাইতে হবে। এটাই আমাদের লক্ষ্য।’
বিশ্বকাপ জিতলে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার সম্মান তারই পাওয়ার কথা। ফুটবল ইতিহাসের সেই বিখ্যাত ছবিগুলোর কথা—পেলে, মারাদোনা, কাসিয়াস কিংবা মেসির ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মুহূর্ত—মনে পড়ে কি না জানতে চাইলে রদ্রি বলেন—
“আমরা জানি সামনে অত্যন্ত কঠিন প্রতিপক্ষ। তারা জানে কীভাবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে হয়। আমাদের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা আছে, তবে একই সঙ্গে শান্তিও আছে। কারণ আমরা জানি, এটাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ম্যাচ।”
ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পর ড্রেসিংরুমে ঢুকে তার বিস্মিত প্রতিক্রিয়ার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমরা দ্বিতীয় বড় ফাইনালে উঠেছি। তখন ভাবছিলাম, এটা আমাদের পরিশ্রম, উন্নতি এবং দল হিসেবে বেড়ে ওঠার কী অসাধারণ প্রমাণ। আমরা ফ্রান্স, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের মতো দলকে হারিয়েছি। অবশ্যই এখনও একটি ধাপ বাকি, কিন্তু আমরা এই সাফল্য নিয়ে গর্বিত।”
রদ্রির ফুটবলের শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ। স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৬ দলে প্রথম ডাক পাওয়ার সময় তার উচ্চতা ছিল মাত্র পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির কাছাকাছি। কিন্তু খেলার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। সেই সময় কি তিনি কল্পনা করেছিলেন বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে নিজেকে দেখবেন?
হেসে রদ্রি বলেন— “সেটা অনেক আগের কথা। প্রথমবার জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার দিনটি ছিল আমার জীবনের অন্যতম আনন্দের মুহূর্ত। তখন বুঝতেই পারিনি সামনে কতটা পথ পড়ে আছে। কখনও ভাবিনি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাব। তবে কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং প্রতিদিন নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা করলে সব কিছুই সম্ভব।”
চোটের কারণে গত মৌসুমে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে তাকে। ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলা আগেই বলেছিলেন, রদ্রির সেরা ছন্দ দেখা যাবে বিশ্বকাপে। সেই ভবিষ্যদ্বাণী যেন সত্যিই বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
রদ্রি বলেন— “এটা কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনার ফল নয়, বরং অনেক আলোচনা ও ধৈর্যের ফল। বড় ধরনের চোট থেকে ফিরেছিলাম। তাই মৌসুমজুড়ে শরীরকে নতুন করে গড়ে তোলাই ছিল লক্ষ্য। জানুয়ারি থেকে আমি ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করেছি। বিশ্বকাপের আগে অনুভব করছিলাম, শারীরিকভাবে আমি দারুণ অবস্থায় আছি, শুধু ম্যাচের ছন্দ দরকার। এখন নিজেকে পুরো মৌসুমের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো মনে হচ্ছে।”
বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে ভালো খেললেও স্পেনের সেরা ফুটবল দেখা গেছে নকআউট পর্বে। রদ্রির মতে, সেটাই ছিল দলের পরিণত মানসিকতার পরিচয়।
“সব কার্ড শুরুতেই দেখিয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো কখন আসে, সেটা বুঝতে হয়। আমরা ঠিক সময়ে নিজেদের সেরা খেলাটা তুলে ধরতে পেরেছি।”
তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালের প্রসঙ্গও উঠে আসে সাক্ষাৎকারে। দুই বছর আগে রদ্রি বলেছিলেন, উন্নতি অব্যাহত থাকলে একদিন ব্যালন ডি’অরের আলোচনায় চলে আসবেন ইয়ামাল। এখন ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ খেলছেন বার্সেলোনার বিস্ময়বালক।
রদ্রি বলেন— “সে অসাধারণ উন্নতি করেছে। সবাই তার ড্রিবলিং ও আক্রমণাত্মক খেলা নিয়ে কথা বলে, কিন্তু আমি সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হই বল ছাড়া তার কাজ দেখে। দল যখন রক্ষণে সাহায্য চায়, তখন সে সেটা বোঝে। ফ্রান্সের বিপক্ষে সম্ভবত সে তার সেরা ম্যাচ খেলেছে। আমি আশা করি, ফাইনালে সে সেই কাঙ্ক্ষিত গোলটিও পাবে।”
ফাইনালে প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা। ফ্রান্সের সঙ্গে ম্যাচের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে বলে মনে করেন স্পেন অধিনায়ক।
“ফ্রান্স গতি ও শক্তির ওপর নির্ভর করে। আর্জেন্টিনা অনেক বেশি সমষ্টিগত দল। তারা বল দখলে রাখতে ভালোবাসে, আক্রমণাত্মক এবং চরিত্রে ভরপুর। আমাদের বুঝতে হবে কীভাবে নিজেদের শক্তি কাজে লাগিয়ে তাদের শক্তিকে দখল করা যায়। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, তাদের দলে এমন অনেক খেলোয়াড় আছে যারা এক মুহূর্তেই ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারে।”
অবধারিতভাবেই আলোচনায় আসে লিওনেল মেসির নাম। কীভাবে তাকে থামাতে হবে?
রদ্রির উত্তর— “প্রথমত তাকে পেনাল্টি এলাকার কাছ থেকে দূরে রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, যখন তাকে রক্ষা করতে হবে, তখন আরও কাছাকাছি থাকতে হবে এবং আরও আক্রমণাত্মক হতে হবে। আমরা এমন একটি দল, যারা প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে পছন্দ করি। তবে মেসির মতো খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। তিনি যে কোনো মুহূর্তে অপ্রত্যাশিত কিছু করে ফেলতে পারেন।”
গত এক দশকে ব্যালন ডি’অর জয়ের ক্ষেত্রে মেসির আধিপত্য ভাঙতে পেরেছেন হাতে গোনা কয়েকজন। তাদের একজন রদ্রি। তবে তিনি ব্যক্তিগত পুরস্কারের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “মেসি নিজেই নিজের পরিচয়। তার ক্যারিয়ারই সবকিছু বলে দেয়। ৩৯ বছর বয়সেও এই পর্যায়ে খেলা এবং বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হওয়া অবিশ্বাস্য। আর্জেন্টিনার জন্য তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি তাদের নেতা ও অনুপ্রেরণা।”
স্পেনের একমাত্র বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইকার কাসিয়াসের সঙ্গে সম্প্রতি দেখা হয়েছে রদ্রির। কাসিয়াসের মতো ট্রফি উঁচিয়ে ধরার সম্ভাবনা কি ভাবাচ্ছে তাকে?
“অবশ্যই এটা বিশেষ কিছু। তবে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শান্ত থাকা। এমন মুহূর্তে মানুষ তাড়াহুড়ো করে ফেলতে পারে। আমাদের স্বাভাবিক থাকতে হবে, ভালোভাবে বিশ্রাম নিতে হবে এবং মাঠে নামতে হবে জয়ের লক্ষ্য নিয়ে।”
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুঞ্জনও চলছে। কিন্তু বিশ্বকাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে বিষয়ে ভাবতে রাজি নন তিনি।
“আমি এখন শুধু বিশ্বকাপ নিয়েই ভাবছি। ক্লাবের সঙ্গে আমার চুক্তি আছে। অন্য সব বিষয় পরে দেখা যাবে। সামনে এমন একটি চ্যালেঞ্জ, যার গুরুত্বের কাছে অন্য সবকিছু তুচ্ছ।”
স্পেনের সমর্থকদের উদ্দেশে তার শেষ বার্তাও ছিল আবেগঘন।
“আমাদের পাশে থাকুন। রাস্তায় নেমে উদযাপন করুন, একসঙ্গে থাকুন। নানা কারণে আমাদের দেশ অনেক সময় বিভক্ত থাকে, কিন্তু ফুটবল সবাইকে এক করে। এখান থেকে আমরা দেশের মানুষের উন্মাদনা অনুভব করতে পারছি। আশা করি ফাইনালের দিন সবাই পর্দার সামনে বসে আমাদের সমর্থন করবেন।”
সাক্ষাৎকারের শেষ প্রশ্ন ছিল কুসংস্কার নিয়ে। রদ্রির উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার ব্যক্তিত্বের মতোই স্পষ্ট—
“আমি কুসংস্কারে বিশ্বাস করি না। আমি বিশ্বাস করি কঠোর পরিশ্রমে।”
বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে স্পেন অধিনায়কের কণ্ঠে কোনো বাড়তি নাটকীয়তা নেই। আছে শুধু আত্মবিশ্বাস, সংযম এবং ইতিহাস গড়ার আকাঙ্ক্ষা। আর হয়তো এ কারণেই রদ্রির কথাগুলো এত বিশ্বাসযোগ্য শোনায়। তিনি জানেন, বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন দেখা সহজ; কিন্তু ট্রফি স্পর্শ করার অধিকার অর্জন করতে হয় সাহস, ধৈর্য এবং নিরলস পরিশ্রম দিয়ে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









