বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ৭ মে,২০২৬, প্রকাশিত হয়েছিল স্পেন জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের প্রথম আত্মজীবনীমূলক বই- ‘জীবন প্রতিদিনের অনুশীলন: এক আত্মজীবনী’ ১৩২ পৃষ্ঠার (কিনডলে ভার্সন)।
এই বই শুধু ম্যাচ, ট্রফি বা সাফল্যের গল্প নয়। এখানে উঠে এসেছে তার ফুটবল-দর্শনের জন্ম, নেতৃত্বের দায়িত্ব সম্পর্কে তার উপলব্ধি, দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা, প্রতিদিনের পরিশ্রমে অবিচল বিশ্বাস এবং নীরবে তাকে পথ দেখানো মানুসিক শক্তির কথা। এটি এমন এক মানুষের আত্মকথা, যিনি প্রতিশ্রুতিকে নিজের পরিচয় বানিয়েছেন এবং প্রতিযোগিতাকে দেখেছেন প্রতিদিন নিজেকে আরও ভালো করে গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে। লুইস দে লা ফুয়েন্তের বিশ্বাস, মাঠে হোক কিংবা মাঠের বাইরে—জীবন আসলে প্রতিদিনের অনুশীলনেরই আরেক নাম। তার নেতৃত্বে স্পেন দ্বিতীয়বারের মতন ফুটবলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হল। ইতিহাস গড়লেন তিনি ও তার দল। ২০ জুলাই স্প্যানিশ পত্রিকা ‘এল কনফেডেশিয়াল’-এ নিজের চিন্তা-বিশ্বাস ও ফুটবল নিয়ে একটি লেখা লিখেছেন। পাঠকদের জন্য আমরা সেই লেখাটি এখানে তুলে রাখলাম।
বন্ধুদের সঙ্গে ছোটবেলায় আমাদের যে দুঃসাহসিক অভিযাত্রাগুলো ছিল, আজও সেগুলো স্পষ্ট মনে পড়ে। কখনো গাছের গুঁড়ি জুড়ে দড়ি বেঁধে তিরোন নদী পার হতাম, কখনো পরিত্যক্ত কোনো ভবনের ছাদে উঠতাম। কেউ আগে উঠে গেলে দড়ি ফেলে দিত, বাকিরা সেই দড়ি ধরে ওপরে উঠত। শেষ মানুষটি না ওঠা পর্যন্ত কেউ ফিরে আসত না।
লাবাস্তিদার কাছে টোলোনো নামে একটি পাহাড় ছিল। আমাদের কাছে সেটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু চূড়া। একা কেউ সেখানে উঠতে পারত না। একজন আরেকজনকে হাত বাড়িয়ে তুলত। কেউ পিছলে পড়লে অন্যজন তাকে ধরে রাখত।
সেখানেই আমি শিখেছিলাম—একসঙ্গে পথ চলার মানে কী।
যদি কোনো বন্ধু আহত হতো, তাকে কাঁধে করে বাস পর্যন্ত নিয়ে যেতে হতো, তারপর বাড়ি পৌঁছে দিতে হতো। পরে তার বাবা-মায়ের বকুনিও শুনতে হতো। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসত না। কারণ আমরা জানতাম, আজ তাকে বহন করছি, কাল হয়তো সে আমাকে বহন করবে।
সেই বয়সেই বুঝেছিলাম, ভালো মানুষ সে-ই, যে কঠিন সময়ে তোমার পাশে দাঁড়ায়। শুধু ভালো ফুটবলার নয়, ভালো মানুষও হতে হবে। আমি যখন কোনো খেলোয়াড়কে দলে নিই, প্রথমেই দেখি সে কেমন মানুষ।
আমার কাছে ভালো মানুষ মানে এমন একজন, যার নীতি আছে; যে সতীর্থের পাশে দাঁড়ায়; যে নিজের চেয়ে দলকে বড় মনে করে; যে কষ্ট সহ্য করতে জানে এবং প্রয়োজনে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করতে পারে।
ফুটবলে আমি এমন খেলোয়াড়ও দেখেছি, যারা শুধু নিজের কথা ভাবত। মাঠে হয়তো তারা দক্ষ ছিল, কিন্তু ড্রেসিংরুমে সবাই বুঝে যেত, তারা দলের মানুষ নয়।
যদি একই মানের আরেকজন খেলোয়াড় থাকে, যে দলকে আগে রাখে, তাহলে আমি তাকেই বেছে নেব। কারণ কোনো ব্যক্তিই কখনো দলের চেয়ে বড় নয়।
তরুণদের সঙ্গে কাটানো সময় আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে
অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৯ এবং অনূর্ধ্ব-২১ দলে দীর্ঘদিন কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সেই অভিজ্ঞতা সিনিয়র দলে আমাকে অনেক ভুল করা থেকে বাঁচিয়েছে।
আমি শুধু একজন খেলোয়াড়ের পায়ের কাজ দেখি না, তার আচরণও দেখি। সে অন্যদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করে, চাপের সময় কেমন থাকে, দলের পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে কি না—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি বুঝি, সে এই পরিবেশের জন্য উপযুক্ত নয়, তাহলে যত প্রতিভাবানই হোক, তাকে দলে নেওয়া কঠিন।
বড় তারকারাও আসলে দলের মানুষ
অনেকেই ভাবেন, বিশ্বের সেরা ফুটবলাররা কেবল নিজের জন্য খেলেন। আমার অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। ডি স্টেফানো, পেলে, ক্রুইফ, ম্যারাডোনা, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কিংবা লিওনেল মেসি—তাদের মতো কিংবদন্তিদের কাছ থেকে আমরা দেখেছি, প্রকৃত মহত্ত্বের সঙ্গে দায়িত্ববোধও আসে। ড্রেসিংরুমের ভেতরে তারা এমন সতীর্থ, যাদের সবাই পাশে পেতে চায়।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সত্যটি একই থাকে—দলের চেয়ে বড় কেউ নয়।
শিক্ষা ও সম্মান—আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ
স্পেন জাতীয় দলের এক খেলোয়াড়ের কথা আজও মনে আছে। এক ম্যাচে তাকে ওয়ার্ম-আপ করতে পাঠিয়েছিলাম। অনেকক্ষণ প্রস্তুতি নেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত তাকে মাঠে নামানো হয়নি। ম্যাচ শেষে আমি তার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইলাম।
সে হেসে বলল, "কোনো সমস্যা নেই, কোচ। আমি দলের জন্যই এখানে। যদি দলের প্রয়োজন না থাকে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।" আমি তখন আরও নিশ্চিত হলাম—এমন মানুষই আমার দলে থাকার যোগ্য।
আমার বাবা-মা আমাকে শিখিয়েছিলেন, মানুষকে সম্মান করতে হয়।
সেভিয়ায় কোচিংয়ের শুরুতে আমি খেলোয়াড়দের পদবি নয়, নাম ধরে ডাকতাম। কিছু চাইলে বলতাম, "দয়া করে এটা এনে দেবে?" কাজ হয়ে গেলে বলতাম, "ধন্যবাদ।" অনেকে অবাক হতো। তাদের কাছে হয়তো এটা অস্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আমার কাছে নয়। সম্মান দেখানো কখনো কর্তৃত্ব কমিয়ে দেয় না।
ভালো মানুষ হওয়া দুর্বলতা নয়। আমি মানুষকে নাম ধরে ডাকতে ভালোবাসি। কারও সঙ্গে কথা বলার সময় তার চোখের দিকে তাকাই। আমার বিশ্বাস, এটুকু সৌজন্য একজন মানুষের প্রাপ্য। তবে ভদ্রতা মানে দুর্বলতা নয়।
আমি শান্ত স্বভাবের মানুষ, কিন্তু প্রয়োজনে কঠোর হতেও জানি। ছোটবেলায় অনেকেই বলতেন, "এত ভালো হয়ো না, মানুষ ঠকাবে।" আমি কখনো সেই কথায় বিশ্বাস করিনি। কারণ ভালো মানুষ হওয়া আর চরিত্রহীন হওয়া এক জিনিস নয়।
আমার কাছে প্রতিটি সম্পর্কের ভিত্তি একটাই—সম্মান।
জাতীয় দল মানে এক টুকরো সমাজ
স্পেন জাতীয় দল আজকের সমাজের মতোই। এখানে ভিন্ন সংস্কৃতি আছে, ভিন্ন ধর্ম আছে, ভিন্ন মতাদর্শ আছে। কিন্তু সবার জার্সি এক, লক্ষ্যও এক। আমরা যখন মাঠে নামি, তখন ব্যক্তিগত পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে একটি পরিচয়—স্পেন আমি যাদের বেছে নিই, তারা জানে কীভাবে নিজের মতকে সম্মান রেখে দলের জন্য একসঙ্গে কাজ করতে হয়।
সহমর্মিতা ছাড়া একসঙ্গে থাকা যায় না।
লামিনে ইয়ামালদের গল্প
আজকের ফুটবলে অনেক খেলোয়াড় একাধিক দেশের হয়ে খেলার যোগ্যতা রাখে। লামিনে ইয়ামাল, ডিন হুইসেন, রবিন লে নর্মাঁ কিংবা আইমেরিক লাপোর্ত—এরা সবাই ভিন্ন পটভূমি থেকে এসেছে। তাদের স্পেনের হয়ে খেলতে রাজি করানো শুধু নিয়মের বিষয় নয়, বিশ্বাসেরও বিষয়।
একজন খেলোয়াড়কে জাতীয় দলে খেলতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, তার আইনি যোগ্যতা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, সে নিজে সেই দেশের হয়ে খেলতে চাইবে। তৃতীয়ত, তাকে দলে ডাকতে হবে। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় শর্তটি। কারণ হৃদয়ের সিদ্ধান্তকে জোর করে বদলানো যায় না। আমার অধীনে এক তরুণ খেলোয়াড় ছিল, পরে সে মরক্কোর হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেয়। আমি সেটাকে পুরোপুরি সম্মান করি।
ফুটবল শেষ পর্যন্ত শুধু পাস, গোল আর ট্রফির গল্প নয়। এটি মানুষের গল্পও। আর সেই গল্পে জয়ী হয় সেই দল, যেখানে সবাই জানে—একজনের সাফল্য নয়, সবার সাফল্যই আসল।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









