কেভিন কিগান ও স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের সম্পর্ককে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। নব্বইয়ের দশকে প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে স্মরণীয় শিরোপা লড়াইগুলোর একটিতে তারা ছিলেন দুই বিপরীত শিবিরের সেনাপতি। কিন্তু মাঠের উত্তাপ কখনোই ব্যক্তিগত সম্মানকে ছাপিয়ে যায়নি।
সোমবার (২০ জুলাই) ৭৫ বছর বয়সে ক্যানসারের কাছে হার মানলেন কেভিন কিগান । কিগানের মৃত্যুর পর ৮৪ বছর বয়সী ফার্গুসন স্মরণ করলেন তার বন্ধু প্রতিম সেই প্রতিদ্বন্দ্বীকে, যাকে তিনি সবসময় শ্রদ্ধার চোখেই দেখতেন।
কেভিনের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ছিল বলেছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি এই কোচ। “নিউক্যাসলের কোচ থাকাকালে আমাদের অনেক লড়াই হয়েছে। কিন্তু নিউক্যাসলের জন্য তিনি যা করেছিলেন, তা ছিল অসাধারণ।”
ফার্গুসনের ভাষায়, কিগান শুধু একটি দলকে বদলে দেননি, নতুন প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন একটি শহর ও তার সমর্থকদের।
“তিনি ক্লাবটিকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছিলেন। সমর্থকদের আবেগ, উন্মাদনা—সবকিছু আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন। সেটিই ছিল তার সবচেয়ে বড় অর্জন।” নিউক্যাসলে ডেভিড জিনোলা, ফাউস্তিনো আসপ্রিলা ও ফিলিপ আলবেয়ারের মতো ফুটবলারদের নিয়ে আসার কথাও স্মরণ করেন ফার্গুসন। “ওই দলটিতে তিনি বাড়তি মান যোগ করেছিলেন। সে সময় নিউক্যাসলের বিপক্ষে আমাদের প্রতিটি ম্যাচই ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ।”
ফার্গুসনের মতে, কিগানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ফুটবলের প্রতি তার অকৃতি ভালোবাসা।
“কেভিন ফুটবলকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করতেন। সেই ভালোবাসা সমর্থকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ত, খেলোয়াড়দের মধ্যেও। নিউক্যাসলে তার সময়টা ছিল আবেগ আর রোমাঞ্চে ভরা। আমার বিশ্বাস, সেটিই ছিল নিউক্যাসলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল।
১৯৯৫-৯৬ মৌসুমে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও নিউক্যাসলের শিরোপা লড়াই ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। সেই মৌসুমে সংবাদ সম্মেলনে কিগানের বিখ্যাত উক্তি—‘I would love it if we beat them’—আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত। কিন্তু মৌসুম শেষ হওয়ার পর মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর ব্যক্তিগত সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলেনি।

ফার্গুসন বলেন, “কেভিনের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল, তিনি কোনো ক্ষোভ পুষে রাখতেন না। মৌসুম শেষ হওয়ার পর আমরা একসঙ্গে দারুণ একটি সন্ধ্যা কাটিয়েছিলাম। কয়েক সপ্তাহ আগে যা-ই ঘটুক না কেন, তিনি সব ভুলে যেতে পারতেন। এই গুণটির জন্য আমি তাকে অনেক বেশি শ্রদ্ধা করতাম।”
ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আজও কিংবদন্তি। কিন্তু কিগানের মৃত্যুর পর ফার্গুসনের স্মৃতিচারণ মনে করিয়ে দিল—সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীরাও কখনো কখনো একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা বহন করেন। আর সেই শ্রদ্ধাই হয়তো শেষ পর্যন্ত একজন কিংবদন্তির প্রকৃত পরিচয় হয়ে থাকে।
সোমবার ৭৫ বছর বয়সে কিগানের ক্যানসারে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সেন্ট জেমস' পার্কের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন সমর্থকেরা। কেউ হাতে ফুল, কেউ পুরোনো ছবি, কেউবা শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে। যেন তারা বিদায় জানাচ্ছেন একজন সাবেক ফুটবলারকে নয়, পরিবারের একজন আপন মানুষকে।
নিউক্যাসল ইউনাইটেডের প্রধান নির্বাহী ডেভিড হপকিনসন বললেন, “আমরা এর কোনো পরিকল্পনা করিনি। মানুষ নিজেরাই এখানে এসেছে, তাকে স্মরণ করতে। এটি সত্যিই হৃদয়স্পর্শী। কেভিনের প্রতি এটি এক অসাধারণ স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি।”
নিউক্যাসলের বর্তমান কোচ এডি হাউ কিগানকে বর্ণনা করেছেন নিজের অনুপ্রেরণা ও বন্ধু হিসেবে। “তিনি সব সময় নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে প্রস্তুত থাকতেন, উৎসাহ দিতেন, পাশে দাঁড়াতেন। এর জন্য আমি সবসময় তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব,” বলেছেন হাউ।
তার ভাষায়, “কেভিনের সঙ্গে প্রতিটি কথোপকথনের পর মানুষ আরও ভালো অনুভব করত। তার অসাধারণ উষ্ণতা, রসবোধ এবং ফুটবলের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা আশপাশের সবাইকে স্পর্শ করত।”
নিউক্যাসলের সমর্থকদের কাছে কিগান কেবল একজন সাবেক খেলোয়াড় বা কোচ নন, শহরেরই একজন। এমনকি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সান্ডারল্যান্ডের সমর্থক এডিও বললেন, “তিনি তো কিংবদন্তি। লাল-সাদা হোক বা কালো-সাদা—এসব কোনো বিষয় নয়।”
১৯৮২ সালে নিউক্যাসলে প্রথমবার খেলোয়াড় হিসেবে যোগ দেন কিগান। তার নেতৃত্বে ক্লাবটি আবার শীর্ষ বিভাগে ওঠার পথে এগিয়ে যায়। এক মৌসুম পর অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। বিদায় ম্যাচ শেষে হেলিকপ্টারে করে সেন্ট জেমস' পার্ক ছেড়ে যাওয়ার সেই দৃশ্য আজও নিউক্যাসলের লোককথার অংশ। যদিও তার জন্ম ইয়র্কশায়ারে, নিউক্যাসলে যোগ দিয়ে কিগান বলেছিলেন, “এখানে এসে মনে হচ্ছে, যেন বাড়িতে ফিরে এসেছি।”
এই অনুভূতির পেছনে ছিল পারিবারিক ইতিহাসও। তার দাদা ফ্রাঙ্ক কিগান ছিলেন কাউন্টি ডারহামের একজন খনি শ্রমিক। ১৯০৯ সালের ওয়েস্ট স্ট্যানলি খনি দুর্ঘটনায় বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে গিয়েও তিনি আবার খনিতে ফিরে গিয়ে অন্য শ্রমিকদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। ফ্রাঙ্ক এবং কেভিনের বাবা জো—দুজনেই ছিলেন আজীবন নিউক্যাসলের সমর্থক।
ফুটবলের ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাদের মৃত্যু সংবাদ পড়ে মনে হয় একটি অধ্যায় শেষ হলো। আবার কিছু মানুষ আছেন, যাদের চলে যাওয়া যেন একটি যুগের দরজা আস্তে করে বন্ধ হয়ে যাওয়ার শব্দ। কেভিন কিগান ছিলেন দ্বিতীয় দলের মানুষ।
তিনি এমন এক সময়ের নায়ক, যখন ফুটবল ছিল ঘাসের গন্ধ, কাদামাখা বুট আর শ্রমজীবী শহরগুলোর আত্মপরিচয়। টেলিভিশনের ক্যামেরা তখনও সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করত না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না, ব্র্যান্ডের চেয়ে বড় ছিল ক্লাবের প্রতীক। কিন্তু সেই পৃথিবীতেই কিগান হয়ে উঠেছিলেন তারকা—কারণ তিনি তারকা হতে চাননি; তিনি শুধু প্রতিটি বলের জন্য শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত দৌড়াতে চেয়েছিলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









