ভোটের মাত্র এক সপ্তাহ আগে ফিক্সড-অডস স্পোর্টস বেটিং নিষিদ্ধ করেছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। অনলাইন বেটিং নিয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্তে দেশটির ফুটবলের বড় অঙ্কের আয় ও স্পনসরশিপ ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রধান ফুটবল ক্লাবগুলো।
ক্লাবগুলোর দাবি, বেটিং কোম্পানিগুলো স্পনসরশিপ বন্ধ করে দিলে তাদের আয় কমে যাবে। এতে অনেক ক্লাব দেউলিয়ার মুখে পড়তে পারে এবং ব্রাজিলের ফুটবলও অস্তিত্ব সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) লুলা একটি নির্বাহী আদেশে (প্রভিশনাল এক্সিকিউটিভ অর্ডার) সই করেন। এর ফলে ফিক্সড-অডস বেটিংয়ের পরিচালনা, অফার, মধ্যস্থতা ও বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে গেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদেশটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে। তবে ১২০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন না পেলে এটি আর কার্যকর থাকবে না। একই সঙ্গে বেটিং অ্যাকাউন্টে নতুন করে অর্থ জমা দেওয়াও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যবহারকারীরা ৫ অক্টোবর পর্যন্ত নিজেদের জমা অর্থ তুলে নিতে পারবেন।
লুলার বক্তব্য
লুলার মতে, ব্যাপক সমস্যা মোকাবিলায় তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। সাও পাওলোতে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘‘আমি একটি কঠোর, কঠিন ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটি (অনলাইন বেটিং) ক্যানসারের মতো, আপনি টিউমারটি অপসারণ করবেন, নইলে টিউমার আমাদের মেরে ফেলবে।’’
চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদেও বেটিং শিল্পের সমালোচনা করেন লুলা। তার অভিযোগ, এই শিল্প ‘আসক্তিকে মুনাফায় পরিণত করছে’ এবং ‘পরিবার ধ্বংস করছে’।
লুলার সরকার ফিক্সড-অডস বেটিংয়ের কিছু কর্মকাণ্ডকে ফৌজদারি অপরাধের আওতায় আনতে একটি বিলও তৈরি করেছে। অনলাইন স্পোর্টস বেটিংয়ের প্রচার এবং ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে বাজিদাতাদের আকৃষ্ট করার বিষয়ও প্রস্তাবিত আইনের আওতায় আনার কথা রয়েছে।
ক্লাবগুলোর আশঙ্কা
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে ব্রাজিলের প্রধান ফুটবল ক্লাবগুলো। নিষেধাজ্ঞার আগে ক্লাবগুলো সতর্ক করেছিল, বেটিং নিষিদ্ধ করা হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো তাদের স্পনসরশিপ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দিতে পারে। ক্লাবগুলোর দাবি, এতে ব্রাজিলের ফুটবলের অস্তিত্বই সংকটে পড়তে পারে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির বড় ১২টি ফুটবল ক্লাবের একটি গ্রেমিও জানিয়েছে, বেটিং কোম্পানিগুলো বৈধ হওয়ার পর থেকে খেলাধুলার অন্যতম প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।
ক্লাবটির বক্তব্য, আইনে পরিবর্তন আনা হলে তা ‘‘শুধু অবৈধ বেটিংয়ের জন্য উন্মুক্ত দরজা তৈরি করবে না, বরং ব্রাজিলের ফুটবলের জন্য মারাত্মক আঘাত হয়ে দাঁড়াবে এবং অনেক ক্লাবকে দেউলিয়ার দিকে ঠেলে দেবে।’’
সম্প্রচারমাধ্যম গ্লোবোর বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ব্রাজিলের প্রধান ফুটবল ক্লাবগুলোকে বেটিং কোম্পানিগুলো ১ দশমিক ১ বিলিয়ন রিয়াল দিয়েছে, যা প্রায় ২১২ মিলিয়ন ডলার বা ১৬০ মিলিয়ন পাউন্ডের সমান। একই সময়ে দেশটির বেটিং শিল্পের আয় ছিল ৬২ দশমিক ৫ বিলিয়ন রিয়াল।
দ্রুত বিস্তার বেটিং শিল্পের
২০১৮ সালে ব্রাজিলে অনলাইন বেটিং বৈধ হওয়ার পর এর ব্যাপক বিস্তার ঘটে। এর আগে দেশটিতে ক্যাসিনো ও স্লট মেশিনসহ অধিকাংশ ধরনের জুয়া অবৈধ ছিল। প্রেসিডেন্ট মিশেল তেমেরের আমলে অনলাইন বেটিংয়ের সুযোগ তৈরি হওয়ার পর সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর শাসনামলে এর বিস্তার আরও বাড়ে।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে লুলা প্রথমবারের মতো বেটিং কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ ও করের আওতায় আনতে আইনে সই করেন। কয়েক মাস পর তার সরকার অনিয়মিত হিসেবে চিহ্নিত ২ হাজারের বেশি অনলাইন বেটিং ওয়েবসাইট বন্ধ করে। এর মধ্যে সাও পাওলোর ফার্স্ট ক্যাপিটাল কমান্ড এবং রিও ডি জেনেইরোর রেড কমান্ডের মতো অপরাধী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু সাইটও ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যবসায়িক বিশ্লেষকদের বরাতে গার্ডিয়ান জানিয়েছে, শুক্রবার নিষিদ্ধ হওয়া বেটিংয়ের অন্যতম ধরন স্পোর্টস বেটিং থেকে ব্রাজিলে বছরে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হয়। ফলে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বেটিং কোম্পানির পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত ক্রীড়া খাতেও পড়তে পারে।
সামাজিক ক্ষতির বিষয়টিও আলোচনায়
বেটিংয়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব স্টাডিজ ফর হেলথ পলিসিজের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনের বরাতে গার্ডিয়ান জানিয়েছে, বেটিং ও জুয়া ব্রাজিলের সমাজে বছরে আনুমানিক ৩৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন রিয়াল ব্যয় তৈরি করে। এর সঙ্গে আত্মহত্যা ও বিষণ্নতা বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির মানুষ প্রতি মাসে প্রায় ৩০ বিলিয়ন রিয়াল বেটিংয়ে ব্যয় করে। এই হিসাবের মধ্যে সরকারের নগদ সহায়তা কর্মসূচি ‘বলসা ফ্যামিলিয়া’র সুবিধাভোগীদের বেটিংয়ে ব্যয় করা অর্থও ছিল। গত বছর এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
বেটিং নিষিদ্ধের পক্ষে জনসমর্থনের চিত্রও একটি জরিপে উঠে এসেছে। অ্যাটলাস ও ব্লুমবার্গের চলতি সপ্তাহের জরিপের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, ব্রাজিলের ৫৯ দশমিক ৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ইন্টারনেট বেটিং নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিরোধিতা
লুলার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি পদক্ষেপটিকে নির্বাচনী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বর্ণনা করেছেন। ফ্লাভিও সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে এবং আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী।
অন্যদিকে ব্রাজিলের বেটিং শিল্পের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দাবি জানানো হয়েছে। তাদের বক্তব্য, নিষেধাজ্ঞা বেটিংয়ের বিদ্যমান চাহিদা দূর করবে না। বরং মানুষ অবৈধ বেটিংয়ের দিকে ঝুঁকলে নিয়ন্ত্রিত বাজারের সুরক্ষা ব্যবস্থা থেকে তারা বঞ্চিত হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









