আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ সূর্যোদয়টাও হলো তার স্বকীয় মহিমায় উজ্জ্বল। বিদায়ের বিষাদ আর প্রাপ্তির আনন্দে মোড়ানো শেষ মঞ্চে আরেকবার ফুটবলের জাদু দেখালেন এই মহাতারকা। বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের দাপুটে জয়ে নিজে করলেন এক গোল, আর সতীর্থদের দিয়ে করালেন দুটি। ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটিতেও নিজের চিরচেনা রূপ—গোল, অ্যাসিস্ট আর আবেগের এক অনবদ্য মিশেল ফুটিয়ে তুলে আর্নেস্টো ভালভার্দে কিংবা মারাদোনার দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের শেষ অধ্যায়ে আঁকলেন এক তুলিহীন আলপনা।
বুয়েনস এইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্টালে ম্যাচটি ঘিরে শুরু থেকেই ছিল বিদায়ের আবহ। ম্যাচ শুরুর আগে বিশাল ‘গ্রাসিয়াস’ লেখা ১০ নম্বর জার্সি মাঠে মেলে ধরা হয়। আর ১০ মিনিটে খেলা থামিয়ে মেসিকে এক মিনিট ধরে সম্মান জানায় পুরো স্টেডিয়াম। গ্যালারিজুড়ে তখন শুধু ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনি।
প্রথমার্ধে একাধিক সুযোগ তৈরি করেও গোলের দেখা পাননি মেসি। ৭ মিনিটে তার দূরপাল্লার শট ঠেকিয়ে দেন বেনিনের গোলরক্ষক। ২৫ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকেও গোলের চেষ্টা করেন তিনি। ৩২ মিনিটে লাওতারো মার্তিনেজের বাড়ানো বল থেকে ভলিতে শট নিলেও লক্ষ্যভেদ করতে পারেননি। তবে বিরতির পর বদলে যায় দৃশ্যপট। ৪৮তম মিনিটে মেসির নেওয়া কর্নার থেকে নিকোলাস ওতামেন্দি গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন। জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলতে নামা দুই অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের সমন্বয়ে আসে গোলটি।
দ্বিতীয়ার্ধের মাত্র ৪৮ মিনিটে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ডান দিক থেকে মেসির নেওয়া কর্নার কিক দারুণভাবে কাজে লাগান নিকোলাস ওটামেন্দি। কাছ থেকে ভলি করে বল জালে পাঠান এই ডিফেন্ডার। আর সেই গোলের কারিগর মেসি। জাতীয় দলের জার্সিতে এটি ছিল তার ৬৮তম অ্যাসিস্ট।
এরপর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করে নেয় আর্জেন্টিনা। ৬১ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ হয়। এবারও গোলের পেছনে মেসি। বক্সের বাইরে থেকে নিকো পাজের দিকে বল বাড়িয়ে দেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। মেসির দেওয়া বল পেয়ে বক্সের প্রান্ত থেকে বাঁকানো শটে বল জালে পাঠান পাজ। গোলরক্ষকের নাগালের বাইরে দিয়ে বল জালে জড়াতেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
দুটি গোলে অবদান রাখার পর এবার নিজেই স্কোরশিটে নাম লেখানোর পালা মেসির। ৬৯ মিনিটে বেনিনের এক ডিফেন্ডারের ফাউলে আর্জেন্টিনা পেনাল্টি পায়। স্পট কিকে বলের সামনে দাঁড়ান সেই মেসিই।
মেসি কোনো ভুল করেননি। ৭০ মিনিটে ডান পায়ের নিখুঁত শটে বল পাঠিয়ে দেন গোলের ওপরের কোণায়। বেনিনের গোলরক্ষক বলের গতিপথ বুঝে ওঠার আগেই জালে জড়িয়ে যায় সেটি। সতীর্থরা ছুটে যান মেসির দিকে। আর মনুমেন্টালের গ্যালারি তখন যেন আবেগের বিস্ফোরণে ফেটে পড়ে। এরপর আর গোল হয়নি। ম্যাচটি শেষ হয় ৩-০ ব্যবধানে।
এর আগে ম্যাচের দশম মিনিটেও থেমেছিল খেলা। মেসির ১০ নম্বর জার্সির প্রতি সম্মান জানিয়ে রেফারি ম্যাচ থামালে পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে করতালিতে অভিবাদন জানায় আর্জেন্টাইন কিংবদন্তিকে। মেসিও হাত নেড়ে সেই ভালোবাসার জবাব দেন।
ম্যাচের আগে মেসি নিজের বিদায় নিয়ে আবেগঘন বার্তা দিয়েছিলেন। তার ভাষায়, ‘আমি শান্তিতে বিদায় নিচ্ছি, নিজের সবটুকু দিয়েছি। এই জার্সি ছিল আমার স্বপ্ন, গর্ব ও জীবন।’
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেকের পর কেটে গেছে ২১ বছরেরও বেশি সময়। এই দীর্ঘ পথচলায় ছিল হতাশা, ব্যর্থতা, শিরোপার অপেক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয়ের মতো সাফল্য। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার পূর্ণতা পেলেও ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর তাঁর বিদায় নিয়ে তৈরি হয়েছিল অপেক্ষা।
অবশেষে সেই বিদায়ও হলো তার চেনা ছন্দে- গোল ও অ্যাসিস্টে। নীল-সাদা জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠ ছাড়ার সময় তাই শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় হয়নি; শেষ হয়েছে আর্জেন্টিনার হয়ে এক কিংবদন্তির মহাকাব্যিক অধ্যায়ের।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









