ফুটবলে কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো ব্যাখ্যা করার জন্য ভাষা যথেষ্ট নয়। প্রতিপক্ষকে বোকা বানিয়ে বল নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা, চোখের পলকে অপ্রত্যাশিত পথে বেরিয়ে যাওয়া, তারপর সতীর্থের সামনে গোলের দরজা খুলে দেওয়া—এসবের মধ্যে শুধু দক্ষতা থাকে না, থাকে এক বিশেষ ধরনের বুদ্ধিমত্তা। গালাতাসারাইয়ের বিপক্ষে লামিনে ইয়ামালের সেই অবিশ্বাস্য পাস আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়: বুদ্ধিমত্তা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি?
ইয়ামাল বলটিকে এমনভাবে দেখালেন, যেন প্রতিপক্ষ সহজেই সেটি কেড়ে নিতে পারবে। ডিফেন্ডার সেই ফাঁদে পা দিতেই বল আড়াল করে বেরিয়ে গেলেন এমন এক পথে, যা কেউ কল্পনাও করেনি। নিজের ভাষায়, এটি ছিল অনেকটা ‘হাফ-রাবোনা’। এরপর অ্যান্থনি গর্ডনের সামনে বলটি এমনভাবে তুলে দিলেন, যেন গোল করার কাজটুকুই শুধু বাকি। মুহূর্তটির সৌন্দর্য এখানেই—যেখানে অন্যরা বিপদ দেখেছে, ইয়ামাল সেখানে আবিষ্কার করেছেন সম্ভাবনা।
কিন্তু এই প্রতিভার জন্ম কোথায়? বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমি তাকে শিখিয়েছে ফুটবলের ভাষা। শিখিয়েছে জায়গা চিনতে, সতীর্থের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে এবং একটি নির্দিষ্ট দর্শনের মধ্যে থেকে খেলতে। কিন্তু আমার মনে হয়, ইয়ামালের সাহসের পেছনে রাস্তার ফুটবলেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। রাস্তা হলো ফুটবলের মুক্ত পরীক্ষাগার, যেখানে কোনো কোচ প্রতিটি পদক্ষেপ ঠিক করে দেন না। সেখানে ভুল করতে হয়, নতুন কৌশল বের করতে হয়, আর প্রতিপক্ষকে চমকে দেওয়ার জন্য নিজের কল্পনাশক্তির ওপর ভরসা রাখতে হয়।
লা মাসিয়া তাকে ভাষা দিয়েছে, রাস্তা দিয়েছে সেই ভাষায় নতুন বাক্য তৈরি করার স্বাধীনতা।
এখানেই আসে বুদ্ধিমত্তার প্রশ্ন। আমরা সাধারণত বুদ্ধিমান মানুষ বলতে বুঝি, যিনি জটিল সমস্যার ব্যাখ্যা দিতে পারেন, যুক্তি সাজাতে পারেন কিংবা নিজের চিন্তা কথায় প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু ফুটবল মাঠে চিন্তার আরেকটি রূপ দেখা যায়, যার জন্য সব সময় শব্দের প্রয়োজন হয় না।
একজন অভিজ্ঞ ফুটবলার জানেন, কখন পাস দিতে হবে, কখন প্রতিপক্ষকে নিজের দিকে টানতে হবে, কখন এক পা পিছিয়ে গিয়ে পরের মুহূর্তে সামনে এগোতে হবে। তিনি হয়তো এসব সিদ্ধান্তের গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে পারবেন না। কিন্তু তাঁর শরীর জানে কী করতে হবে।
হাজার হাজারবার অনুশীলনের ফলে বল নিয়ন্ত্রণ, পায়ের কোণ কিংবা পাসের জোর নির্ধারণের মতো কাজগুলো প্রায় স্বয়ংক্রিয় হয়ে যায়। তখন খেলোয়াড়ের মনোযোগ মুক্ত থাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্য: প্রতিপক্ষ কোথায়? কোন জায়গাটি এক সেকেন্ড পর খালি হবে? কী করলে পুরো পরিস্থিতি বদলে যাবে?
এই কারণেই ফুটবল শুধু পায়ের খেলা নয়। এটি একই সঙ্গে স্থান, সময়, সম্পর্ক, অনুমান ও কল্পনার খেলা। একজন শিল্পী যেমন হাত দিয়ে ভাবেন, পিয়ানোবাদক আঙুল দিয়ে সংগীতের পথ খুঁজে নেন, তেমনি একজন ফুটবলারও তাঁর পায়ের মাধ্যমে চিন্তা করেন।
ইয়ামালের বিশেষত্ব হলো, তার পা যেন মস্তিষ্কের চিন্তার অপেক্ষায় থাকে না। দুজনের মধ্যে যোগাযোগ এতটাই নিবিড় যে সিদ্ধান্ত আর প্রয়োগের মাঝখানে প্রায় কোনো দূরত্বই থাকে না।

আমাদের সংস্কৃতি কেন এত দিন মাঠের এই বুদ্ধিমত্তাকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে দেরি করেছে? সম্ভবত আমরা এমন জ্ঞানকেই বেশি মূল্য দিই, যা কথায় ব্যাখ্যা করা যায় কিংবা বইয়ের পাতায় লেখা সম্ভব। অথচ কোনো সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে না পারা মানেই সিদ্ধান্তটি বুদ্ধিহীন নয়।
ইয়ামাল তার অসাধারণ কীর্তিগুলোর ব্যাখ্যা দিতে পারেন কি না, সেটি বড় কথা নয়। তিনি মাঠে যা করে দেখান, তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার চিন্তার পরিচয়।
ফুটবল কখনো কখনো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের বুদ্ধিমত্তার সবটুকু মাথার ভেতর বন্দী নয়। তার কিছু অংশ থাকে শরীরে, অভ্যাসে, অনুভবে—আর কখনো কখনো একটি ফুটবলের ওপর রাখা পায়ের স্পর্শে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









