জলবায়ু সংকট এখন কেবল পরিবেশগত কোনো সমস্যা নয়, এটি দেশের শ্রম খাত, জনস্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। চরম তাপপ্রবাহের কারণে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত “জলবায়ু সংকট ও কাজের ভবিষ্যৎ: টেকসই ও ন্যায্য বাংলাদেশের পথে যাত্রা” শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ, ‘সাসটেইনেবল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন প্রোগ্রাম’-এর সহযোগিতায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের নির্বাহী সমন্বয়ক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ। এতে সিভিল সোসাইটি, জাতীয় ও খাতভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়ন, পরিবেশবাদী আন্দোলন এবং যুব ও নারী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন।
২০২৬ সালেও চরম তাপপ্রবাহ ও এল নিনোর হুলিয়া:
আলোচনার শুরুতে বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের (বিএলএফ) প্রোগ্রাম ডিরেক্টর রাইসুল ইসলাম খান এবং মূল উপস্থাপনায় প্রোগ্রাম অফিসার মো. জুবায়ের আলম দেশের বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন।
উপস্থাপনায় জানানো হয়, ২০২৪ সালের রেকর্ডভাঙা তীব্র তাপপ্রবাহের পর ২০২৬ সালেও দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে অবস্থান করছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে, জুন-আগস্ট ২০২৬ মেয়াদে 'এল নিনো' পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ, যা চলমান তাপপ্রবাহ ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
অর্থনীতি ও শ্রম খাতে বড় ধাক্কা:
চরম তাপমাত্রা, বিদ্যুৎ সংকট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শ্রমিকদের ওপর নেমে আসা অবর্ণনীয় কষ্টের কথা উল্লেখ করে বক্তারা বলেন:
কর্মঘণ্টা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি: তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির (হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, কিডনি জটিলতা) কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২৫ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে প্রতিবছর প্রায় ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ।
তৈরি পোশাক খাতে বিপর্যয়: যদি এখনই কার্যকর অভিযোজন ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় ক্ষতি হতে পারে এবং প্রায় ১০ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।
নীতিনির্ধারক ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর প্রতি তীব্র ক্ষোভ:
আলোচনায় শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের শিল্পনীতিতে শুধু উৎপাদনের পরিমাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু শ্রমিকদের জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় কার্যত উপেক্ষা করা হচ্ছে।”
ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের চেয়ারপারসন কুতুবউদ্দিন আহমেদ বলেন, “প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা যাবে না। প্রকৃতির বিরুদ্ধে গেলে প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নেবেই।”
অন্যদিকে, বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির কল্পনা আক্তার বলেন, “বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো একদিকে ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ বা পরিবেশবান্ধব কারখানার কথা বলে, অন্যদিকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করে না। এই ভন্ডামি বন্ধ করতে হবে।”
জাস্ট এনার্জি ট্রাঞ্জিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেট) এর ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ বলেন, “নীতিনির্ধারকেরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে কার্যকর রূপান্তর সম্ভব নয়।” তিনি কৃষিজমি নষ্ট না করে অনাবাদি জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় ঝুঁকি:
ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়ক সোহানুর রহমান পরিবেশ দূষণের এক ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরে বলেন, “বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশু বর্তমানে সিসাজনিত বুদ্ধিবিকাশ সমস্যায় ভুগছে। জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
সংকট উত্তরণে ৭ দফা সুপারিশ:
সভাপতির বক্তব্যে সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, প্রতি বছর বৈশ্বিক স্লোগান দেওয়া হলেও শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন খুব কম দেখা যায়। শ্রমিকদের কষ্ট ও সংকটকে অগ্রাধিকার দিয়ে বক্তারা বেশ কিছু জরুরি দাবি ও সুপারিশমালা পেশ করেন:
১. তাপ সুরক্ষা আইন: কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের সুরক্ষায় বাধ্যতামূলক ‘তাপ সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন করতে হবে।
২. সামাজিক নিরাপত্তা: জলবায়ু-সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং শ্রমিকদের জন্য জলবায়ু-সহনশীল আবাসন ও নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করতে হবে।
৩. নবায়নযোগ্য জ্বালানি: সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
৪. জমির সঠিক ব্যবহার: সৌর প্রকল্পের জন্য কৃষিজমির পরিবর্তে অনাবাদি বা অবক্ষয়িত জমি ব্যবহার করতে হবে।
৫. পরিবেশ পুনরুদ্ধার: নগর সবুজায়ন ও হারিয়ে যাওয়া জলাধারগুলো দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে হবে।
৬. বৈশ্বিক ফোরামে যৌথ দাবি: আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে শ্রমিকদের সুস্পষ্ট দাবি তুলে ধরতে একটি ‘যৌথ পজিশন পেপার’ তৈরি করতে হবে।
৭. অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন: ‘মানুষ, মুনাফা এবং পৃথিবী’—এই তিনের মধ্যে কেবল মুনাফাকে গুরুত্ব না দিয়ে টেকসই উন্নয়নকে অস্তিত্ব রক্ষার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
বক্তারা পরিশেষে উল্লেখ করেন, ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ ও পরিবেশ বিপর্যয় এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় মানবাধিকার চ্যালেঞ্জ। তবে সঠিক ও সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ জলবায়ু-সহনশীল ও ন্যায্য উন্নয়নের একটি বৈশ্বিক উদাহরণ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









