দেশে শিশু নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ২০২৫ সালেই ১১০০ নারী ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে ঢামেক হাসপাতালে গিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত এবং নির্যাতন প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকরা।
গতকাল শনিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তারা এ আহ্বান জানান।
গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান, আইনজীবী রাশনা ইমাম প্রমুখ।
বৈঠক সঞ্চালনা করেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম। সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আহ্বান জানান শিশুদের নৈতিক শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু করার। আর ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল শিশু সুরক্ষায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে জাতীয় শিশু সুরক্ষা টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান জানান। আলোচনায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান বলেন, শুধু ২০২৫ সালেই ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে ১১০০ নারী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন। তার মতে, এ পরিসংখ্যান নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্রই তুলে ধরে।
বক্তারা বলেন, মাদকসহ সমাজের কয়েকটি বড় ব্যাধি নির্মূল করতে পারলে শিশু নির্যাতনের ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এজন্য সামাজিক আন্দোলন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা। বলেন, রাষ্ট্র যদি নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে উন্নয়নের সাফল্য অর্থহীন হয়ে পড়ে। সম্প্রতি আলোচিত শিশু রামিসার বাবা হান্নান মোল্লা তার মেয়ের নির্যাতন ও হত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকরের দাবি জানান। তার বক্তব্যে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আলোচকদের মতে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিশুদের জন্য আরো নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দেশের প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় নয়জন কোনো না কোনো ধরনের মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এক থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ বা ৪৫ মিলিয়নেরও বেশি শিশু সহিংস শাসনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার মামলায় দণ্ডাদেশের হার মাত্র ২ শতাংশ। ইউনিসেফ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (এমআইসিএস) তথ্য অনুসারে, এক থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৫.৭ শতাংশ শিশু ‘ভায়োলেন্ট ডিসিপ্লিন’ বা সহিংস শাসনের শিকার।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুসারে, গত বছর শিশু ধর্ষণের রিপোর্টকৃত ঘটনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫৬টি, যেখানে ২০২৪ সালে পুরো বছরে এ সংখ্যা ছিল ২৩৪। একই সময়ে ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনা ৬৬ থেকে বেড়ে ১২৯-এ পৌঁছেছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনায় ৫৬৬টির বেশি মামলা হলেও মাত্র ২ শতাংশ ক্ষেত্রে দণ্ডাদেশ কার্যকর হয়েছে। জাতীয় শিশু হেল্পলাইন ১০৯৮-এ গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চার লাখ ২৫ হাজার ৬৫১টি কল এসেছে। এর মধ্যে তিন লাখ ১৪ হাজার ৪৩৫টি ছিল নির্যাতন, শোষণ ও মনোসামাজিক সহায়তা সংক্রান্ত।
আয়োজক সংগঠনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম জানান, চলতি বছরের ১৫ মে পর্যন্ত ৯৩৬ জন নারী ও কন্যা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১৩২ জন শিশু ও ৭৫ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ২০৭ জন নারী ও শিশু হত্যার শিকার হয়েছেন।
বৈঠকে শিশু সুরক্ষায় ১০ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক চাইল্ড প্রোটেকশন পলিসি; জেলা ও উপজেলায় চাইল্ড প্রোটেকশন কেস ম্যানেজমেন্ট ডেস্ক; দ্রুত তদন্ত, ফরেনসিক সহায়তা ও দ্রুত বিচার; শিশু হেল্পলাইন ১০৯৮-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি; শিশু-সংবেদনশীল গণমাধ্যম নীতিমালা; সেফ টাচ-আনসেফ টাচ ও অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে জাতীয় সচেতনতা কর্মসূচি; শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত জাতীয় ডাটাবেস; গণমাধ্যমে ফলোআপ রিপোর্টিং ব্যবস্থা; চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম।
বৈঠকে বক্তারা বলেন, শিশু নির্যাতন রোধে এখন আর বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে কাজ হবে না। রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্যখাত এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় রামিসাদের হারানোর মিছিল থামানো কঠিন হবে। শিশু সুরক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে কার্যকর আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণেরও আহ্বান জানান বক্তারা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









