## উপসর্গে আরো ৮ শিশুর মৃত্যু
## ইউনিসেফ থেকে টিকা কিনছে সরকার
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে মারা গেছে আরো আটজন শিশু। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে গত ৮৫ দিনে হাম ও রোগটির উপসর্গে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩৯ জনে। তাদের মধ্যে হামে আক্রান্ত ছিল ৯২ জন আর সন্দেহজনক হাম রোগের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে বাকি ৫৪৭ জন।
এদিকে চিকিৎসকরা বলছেন, হামের উপসর্গ ভয়াবহ সিভিয়ার নিউমোনিয়ার কারণে লাইফ সাপোর্ট লাগছে অনেক শিশুর। যা বিকল করে দিতে পারে ফুসফুস। অসুস্থতা ঠেকাতে চিকিৎসকের পরামর্শে পুষ্টিকর খাবার, ভিটামিন ও জিংক খাওয়ানোর পরামর্শ তাঁদের। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার সুফলে হামে নতুন ভর্তি কমলেও জটিল রোগীদের নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা। হামের সঙ্গে অ্যাডিনো ও বোকা ভাইরাসের সংক্রমণেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। এতেই ভয়াবহ নিউমোনিয়ায় বিকল হচ্ছে শিশুর ফুসফুসের টিস্যু, অবস্থা হচ্ছে সংকটাপন্ন।
এ পরিস্থিতিতে হাম থেকে বাঁচতে টিকার বিকল্প নেই। তবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়তে সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। হাম পরবর্তী জটিলতা থেকে শিশুকে সুরক্ষা দিতে সুস্থ হওয়ার পরও অন্তত দেড় মাস বিশেষ সচেতনতার মধ্যে রাখারও পরামর্শ তাঁদের। এদিকে টিকা দেওয়া থাকলেও আক্রান্ত হচ্ছে অনেক শিশু, প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে তাদেরকে জানিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা।
হাসপাতালে ভিড় কিছুটা কমের দিকে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের হাম বিষয়ক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে গতকাল বুধবার সকাল আটটা পর্যন্ত ভাইরাসজনিত রোগটির উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৯৪৫ জন শিশুর শরীরে, যাদের মধ্যে ৮২৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, হাম শুধু জ্বর বা শরীরে ফুঁসকুড়ির রোগ নয়। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং অন্যান্য জটিলতা হলে এটি হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী। তাই অল্প অসুখেই সচেতন হয়ে রোগীদের নিয়ে হাসপাতালে আসছেন অভিভাবকরা।
এরপরও আগের দিনের তুলনায় হাসপাতালগুলোতে হাম ও উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের ভিড় ধীরগতিতে কমছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, ওই একদিনে নতুন করে নিশ্চিত হামরোগে আক্রান্ত হয়েছে ৯৪ জন শিশু। আর এ নিয়ে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজার ২৯ জনে, যাদের মধ্যে নয় হাজার ৯২৭ জন শিশুর শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে।
এদিকে ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে মৃত আটজন শিশুর মধ্যে ছয়জনই ঢাকা বিভাগের এবং একজন করে রয়েছে সিলেট ও বরিশাল বিভাগের। জেলা হিসেবেও ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ছয়জন শিশু মারা গেছে। হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ৩১০ জন রোগী ঢাকা বিভাগের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছে।
এরপর আছে চট্টগ্রাম বিভাগের ১৪০, বরিশাল বিভাগের ১১৯, খুলনা বিভাগের ৬৭, সিলেট বিভাগের ৬৬, রাজশাহী বিভাগের ৫৮, ময়মনসিংহ বিভাগের ৫২ এবং সবচেয়ে কম ১৭ জন ভর্তি হয়েছে রংপুর বিভাগে।
অন্যদিকে বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুসারে, ওই একদিনে সবচেয়ে বেশি ৪২১ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এরপর চট্টগ্রামে ১৪৩, বরিশালে ১১৯, খুলনায় ৬৯, ময়মনসিংহে ৫২, রাজশাহীতে ৫৮, সিলেটে ৬৬ এবং রংপুরে ১৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৮৫৩ জন শিশু হাসপাতাল থেকে ছুটিও পেয়েছে।
সারাদেশে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক ও হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ৬৬ হাজার ৯৯৯ , যাদের ৬৩ হাজার ১৪৫ জন শিশু সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগের হাম ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ২৮৫ ও আক্রান্ত হয়েছে ৪৫ হাজার ১১০ জন।
নতুন আতঙ্ক লাইফ সাপোর্ট
রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, উদ্বেগ উৎকন্ঠায় অভিভাবকদের অপেক্ষা হাম বিশেষায়িত আইসিইউয়ের সামনে। নতুন আতঙ্ক লাইফ সাপোর্ট। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা নেয়ার পরও সুস্থ না হওয়ায় দুশ্চিন্তায় তারা। তবে কিছু অভিভাবকের আছে অবহেলার ছাপ। কেউ শুরুতে গুরুত্ব দেননি আবার কেউ এতো জটিল পরিস্থিতির পরও দেননি টিকা।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, টিকার সুফলে নতুন রোগী কমলেও, জটিল রোগীদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মারাত্মক নিউমোনিয়ায় বিকল হচ্ছে শিশুর ফুসফুসের টিস্যু।
তিনি বলেন, এ ছাড়া নতুন করে শঙ্কা বাড়াচ্ছে অ্যাডিনো ও হিউম্যান বোকা ভাইরাসের সংক্রমণ। যার কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।
চারমাসের আদিয়ানের জন্য এমনই নীরব আহাজারি দেখা গেছে নানা মো. মাসুদের। নয়দিন ধরে শিশুটি যুদ্ধ করছে হাম নিয়ে। আটদিন আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকার পর গতকাল বুধবার নেওয়া হয় আইসিইউতে। রাখতে হবে লাইফ সাপোর্টেও। এতেই অন্ধকার নেমে এসেছে আদিয়ানের পরিবারে। আদিয়ানের মতোই হাসপাতালে ভর্তি অধিকাংশ শিশুরই আছে শারীরিক অন্য জটিলতা। কেউ দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকলেও গুরুত্ব না দেওয়ায় পড়তে হয়েছে সংকটাপন্ন অবস্থায়। আরও ভয়ংকর বিষয়, হাম এতো গুরুতর হওয়ার পরও টিকা দেননি অনেক অভিভাবক। অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, আগে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরাদের কেউ কেউ আবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আসছে।
এর কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, সিভিয়ার নিউমোনিয়া, যা বিকল করে দিতে পারে শিশুর ফুসফুস। ফের অসুস্থ হওয়া ঠেকাতে বাড়ি ফেরার পর চিকিৎসকের পরামর্শে পুষ্টিকর খাবার, ভিটামিন ও জিংক খাওয়ানোর পরামর্শ এই শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের।
ইউনিসেফ থেকে টিকা কিনছে সরকার
দেশে হামের এই প্রাদুর্ভাবে প্রতিনিয়ত শিশু মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ইউনিসেফ থেকে টিকা কিনছে সরকার।
চলতি অর্থবছরের প্রয়োজনীয় টিকা কেনায় ৪১২ কোটি ৭১ লাখ টাকা বরাদ্দের অনুমোদন মিলেছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে। সচিবালয়ে গতকাল বেলা পৌনে ১১টায় হওয়া এ বৈঠকে টিকা কেনার সিদ্ধান্তে কমিটির সায় মিলেছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সরকার রীতিমতো হিমশিম খায়। তখন উঠে আসে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনার বিষয়টিও। এর মধ্যে আগুনে ঘি ঢেলেছিলেন ঢাকায় ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স। ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেছিলেন, টিকার ঘাটতি নিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি পাঠিয়েছেন তারা এবং বৈঠক হয়েছে অন্তত ১০টি।
বাংলাদেশে টিকার ‘আসন্ন ঘাটতির’ কথা তুলে ধরে জাতীয় নির্বাচনের দুদিন আগে ১০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে যে চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন রানা ফ্লাওয়ার্স, সে খবরও প্রকাশ পায় সংবাদমাধ্যমে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সংবাদ সম্মেলন করে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘আমার সামনে হয়ত সবগুলো তারিখ এখন নেই এবং আমার ধারণা, সেটি তদন্তে বেরিয়ে আসবে। তবে আমি জানি, ২০২৪ সাল থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ কি ছয়টি চিঠি পাঠিয়েছি। এই চিঠিগুলো গেছে এই আশায় যে, নতুন সরকারের যিনি ওই পদে আসবেন, তিনি যেন চিঠিটি তার ডেস্কে পেয়ে যান। এরপর আমরা জানতে চেয়েছি এবং বৈঠক করতে চেয়েছি।’
রানা ফ্লাওয়ার্সের দাবি, টিকা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্তত ১০টি বৈঠক হয়েছে তার।
তিনি বলেছিলেন, বলেছি, ‘আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখুন, আমি চিন্তিত যে, আপনারা ঘাটতিতে পড়তে যাচ্ছেন।’
২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় টিকা আনত সরকার। এতে অর্থায়ানের মূল উৎস ছিল দাতাদের সহায়তা। কিন্তু গত বছর এটিকে রাজস্ব বাজেটের খরচের আওতায় এনে উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ার পথে এগোয় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।
এ ছাড়া জুলাই গণআন্দোলনের সময়কার বিরূপ পরিস্থিতি এবং টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের কারণেও টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









