বাংলাদেশের মানুষের কাছে বরাবরই দুঃখের নাম তিস্তা। ভারত-সৃষ্ট পানিবৈষম্যের কারণে বছরের একাংশে যেমন খরার শিকার হতে হয়, তেমনি বর্ষা মৌসুমে পড়তে হয় বন্যার কবলে। এবারও টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলের কারণে রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের চরাঞ্চল ছাড়াও কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। গত দুইদিনে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চলের গ্রামীণ রাস্তাঘাট, কৃষকের ধান, বাদাম, মরিচসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত তলিয়ে গেছে।
এদিকে পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় হাতীবান্ধায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে। শুক্রবার বিকাল ৩টায় তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টে পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫১.৮৩ মিটার (স্বাভাবিক ৫২.১৫ মিটার)। যা বিপৎসীমার ৩২ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে দুপুরে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ বার্তায় লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শুনিল কুমার রায় বন্যার শঙ্কার কথা জানান। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া শাখার উপ-প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাশেদীন বলেন, অব্যাহত বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। পানির চাপ সামলাতে ৪৪টি জল কপাট খুলে রাখা হয়েছে। লালমনিরহাট সদর উপজেলার কালমাটির বাসিন্দা কৃষক রফিকুল ইসলাম (৫০) বলেন, গত দুইদিন ধরে বাড়িতে পানি ওঠায় চুলা জ্বালাতে পারছি না। তাই খেয়ে-না খেয়ে দিন পার করছি। দিনে একবার রান্না করাই কষ্টকর।
লালমনিরহাটের তিস্তা, ধরলা, স্বর্ণামতিসহ বিভিন্ন নদ-নদীর বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শুনিল কুমার রায় জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের সব প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে রংপুর বিভাগের তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি গত দুই দিনে সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি আরো জানান, আবহাওয়া সংস্থাসমূহের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত রংপুর বিভাগ ও তৎসংলগ্ন উজানে ২৪ ঘণ্টায় অতি ভারী বৃষ্টিপাতের (৮৯ মি.মি.) সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরবর্তী ২ দিনে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসতে পারে। এর প্রেক্ষিতে তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি সমতল আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে পরবর্তী একদিন পর্যন্ত তা স্থিতিশীল এবং এর পরদিন থেকে তা হ্রাস পেতে পারে। এ অবস্থায় আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লালমনিরহাট জেলার তিস্তা নদীর পানি সমতল সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং জেলার নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল ছাড়াও কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে তিস্তাসহ লালমনিরহাটের সবকটি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যারাজ পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম না করলেও তিস্তা নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তবে পানি দ্রুত নেমে যাবে। নদীতে পলি পড়ে পানি ধারণ ক্ষমতা কমে আসায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ আবহাওয়াবিদ মো. মোস্তাফিজার রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুর জেলায় ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শুক্রবার রংপুর বিভাগসহ দেশের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
উত্তরের ৪ জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আভাস
বর্তমানে দেশের সব প্রধান নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভারি বৃষ্টিপাতের প্রভাবে উত্তরের নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুরে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী নুসরাত জাহান জেরিন গতকাল শনিবার বলেন, “বৃষ্টিপাতের কারণে এই চার জেলায় নদ-নদীর পানি বেড়েছে। তাতে স্বল্পমেয়াদি অর্থাৎ কমপক্ষে তিন দিন মেয়াদে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’ শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদ-নদীর পানি সমতল বেড়েছে, যা আগামী তিন দিন বাড়তে পারে।
আগামী ৭২ ঘণ্টায় এসব নদ-নদীর পানি নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলায় বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
হুহু করে বাড়ছে তিস্তার পানি: আবহাওয়া অধিদপ্তরের শনিবারের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের সব প্রধান নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কেন্দ্রের তথ্য বলছে, শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, সিলেট ও খুলনা বিভাগে ভারি থেকে অতি ভারি এবং উজানে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ভারি বৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র বলছে, আগামী পাঁচ দিন রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয় প্রদেশে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।
বুলেটিনে বলা হয়েছে, শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল রয়েছে, যা আগামী পাঁচ দিন বাড়তে পারে। তবে তা বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে বলে আভাস দেওয়া হয়েছে। গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল রয়েছে, যা আগামী তিন দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে। এর পরের দুদিন পানি বাড়তে পারে, যা বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে।
বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দ্রুত বাড়ছে তিস্তা নদীর পানি। ইতোমধ্যে নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলগুলোতে পানি প্রবেশ শুরু করেছে। এতে অনেক নিম্নাঞ্চল ও চর এলাকা আংশিক প্লাবিত হয়েছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, শনিবার সকাল ৯টায় লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দোয়ানী তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে নদীর পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক ০২ মিটার। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। অর্থাৎ পানি বিপৎসীমার মাত্র ১৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগের দিন শুক্রবার সকাল ৯টায় একই পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ৫১ দশমিক ৬৪ মিটার। সে হিসেবে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় তিস্তার পানি বেড়েছে ৩৮ সেন্টিমিটার।
অন্যদিকে কুড়িগ্রামের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শনিবার সকাল ৯টায় চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি রেকর্ড করা হয়েছে ২১ দশমিক ২৫ মিটার, যা বিপৎসীমার প্রায় ২ মিটার নিচে। পাটেশ্বরী পয়েন্টে দুধকুমার নদের পানি ছিল ২৮ দশমিক ৭০ মিটার, যা বিপৎসীমার ১ দশমিক ৫৩ মিটার নিচে। একই সময় ধরলা নদীর ব্রিজ পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ২৩ দশমিক ৭৯ মিটার। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ২৬ দশমিক ৫০ মিটার।
তিস্তা তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী এলাকার কৃষক সুলতান মাহমুদ জানান, শনিবার ভোর থেকেই তাদের এলাকায় নদীর পানি ঢুকতে শুরু করেছে। পানি আরও কিছুটা বাড়লেই বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
কালীগঞ্জ উপজেলার চর শৌলমারী এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, আমাদের চর ইতোমধ্যে পানিতে ডুবে গেছে। এখনও বাড়িতে অবস্থান করছি। তবে পানি আরেকটু বাড়লে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। কয়েকদিন ধরে রাতে নিয়মিত বৃষ্টি হচ্ছে, আর উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের পানিও অব্যাহতভাবে আসছে।
তিনি আরো বলেন, উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের পানি অব্যাহতভাবে আসছে। ফলে তিস্তার পানি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









