ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত দুইটা। স্ক্রিনের আলোয় চোখ রেখে চাতকের মতো চেয়ে আছেন এক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ। হঠাৎ করেই তাঁর ফেসবুক মেসেঞ্জার কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ থেকে পরিচিত বন্ধুদের ইনবক্সে একের পর এক বার্তা যেতে শুরু করল “দোস্ত, খুব জরুরি দরকার। এক হাজার টাকা দিয়ে একটু হেল্প কর। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ব্যাক দিচ্ছি।”
গভীর রাতের এমন বার্তা দেখে বন্ধুরা ভাবলেন, নিশ্চয়ই কোনো বড় বিপদ। কেউ হাসপাতালে, কিংবা কোনো জরুরি সংকটে। মুহূর্তেই বিকাশ বা নগদে চলে এলো টাকা। কিন্তু সকাল গড়িয়ে রাত হলেও সেই টাকা আর ফেরত আসে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, কোনো মানবিক বিপর্যয় নয়; বরং টাকাগুলো সরাসরি চলে গেছে আন্তর্জাতিক এক অনলাইন জুয়ার সাইটের ডিজিটাল ওয়ালেটে।
বরিশাল নগরীসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে এক নীরব মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে এই অনলাইন জুয়া বা ‘বেটিং’। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, উদীয়মান তরুণ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে দিনমজুর, সবাই এখন এই অদৃশ্য ফঁদে বন্দি। একসময় যা নির্দিষ্ট অন্ধকার ঘরে বা আড্ডায় সীমাবদ্ধ ছিল, প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে সেই জুয়ার আসর এখন ঢুকে পড়েছে প্রতিটি ঘরের শোবার ঘরে, মানুষের হাতের মুঠোয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বেট৩৬৫, ১এক্সবেট, বেটওয়ে , ডাফাবেট, জেটবাজ, টেনক্রিকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বেটিং প্ল্যাটফর্ম এবং ক্যাসিনোভিত্তিক অ্যাপ ব্যবহার করে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ঝুঁকিপূর্ণ খেলা চলছে। মূলত ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন লাইভ খেলাকে কেন্দ্র করে বাজি ধরা হচ্ছে। এর বাইরেও রয়েছে অনলাইন ক্যাসিনো, লুডু বেটিং ও ভার্চ্যুয়াল গেমিংয়ের ফাঁদ।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে বন্ধুরা মিলে আড্ডা দেওয়ার ছলে কিংবা সহপাঠীর প্ররোচনায় একজন তরুণ প্রথম এই জগতে পা বাড়ায়। শুরুতে অল্প কিছু টাকা জিতে যাওয়ার পর এক ধরণের ছদ্ম-আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। মনে হয়, এটাই বুঝি সহজে বড়লোক হওয়ার সংক্ষিপ্ত পদ। কিন্তু এই ক্ষণস্থায়ী জয়ই মূলত তাদের স্থায়ী অন্ধকারের দিকে টেনে নেয়। একপর্যায়ে বড় অঙ্কের টাকা হারার পর, সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার অন্ধ মোহ তৈরি হয়। আর তাতেই বাড়ে ঋণের বোঝা।
সরকারি বিএম কলেজের শিক্ষার্থী মো: আবুল কালাম আজাদ (ছদ্মনাম) জানান, শুরুতে কয়েকবার জিতে মনে হয়েছিল ভাগ্য আমার পক্ষে। এরপর হারতে হারতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খোয়াই। ধার-দেনা করতে করতে বন্ধুদের মুখ দেখানোর পথ বন্ধ। পড়াশোনা তো নষ্ট হয়েছেই, এখন নিজের ওপর ঘেন্না হয়।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফ হেসেন (ছদ্মনাম) বলেন, প্রতিবার হারার পর মনে হতো পরেরবার জিতব। এই ‘পরেরবার’ এর আসায় পরিবার থেকে নানা বাহানায় টাকা এনে জুয়ায় ঢেলেছি। জুয়ার টাকা কখনো ঘরে থাকে না, জুয়ার ভেতরেই হারিয়ে যায়।
সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের শিক্ষার্থী ইব্রাহিম মোল্লা (ছদ্মনাম)। প্রথমে বন্ধুকে টাকা ধার দিয়ে ডাবল প্রফিট পেয়ে কৌতূহলী হন, পরে নিজেই নামেন জুয়ায়। বর্তমানে তাঁর অবস্থা এতটাই করুণ যে, জুয়া খেলার টাকা না পেলে ঘরে ভাঙচুর ও অস্বাভাবিক আচরণ করেন তিনি।
এই মরণনেশা কেবল উচ্চবিত্ত বা শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, হকার, সেলুনকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, এমনকি রিকশাচালক ও দিনমজুরদের একটা বড় অংশ এখন সারাদিনের উপার্জনের টাকা তুলে দিচ্ছেন অনলাইন জুয়ার সাইটে।
ডিজিটাল লেনদেন বা মোবাইল ব্যাংকিং এর সহজলভ্যতা এই অপরাধকে আরও সহজ করে দিয়েছে। কোনো একাউন্টে টাকা রিচার্জ করা বা উইথড্র করা এখন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। অনেক ক্ষেত্রে একেকজন ব্যক্তি প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাজি ধরছেন। জুয়ার টাকা জোগাতে গিয়ে অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন চুরি, ছিনতাই কিংবা প্রতারণার মতো অপরাধে।
গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থী সেলিম ইসলাম বলেন, বিষয়টি এখন সামাজিক ভীতিতে রূপ নিয়েছে। বন্ধুরা রাতের বেলা জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে টাকা ধার নেয়, পরে জানা যায় তারা জুয়া খেলছিল। এখনই লাগাম না টানলে একটা পুরো প্রজন্ম পঙ্গু হয়ে যাবে।
মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, অনলাইন জুয়ার এই বিস্তার শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করছে না, বরং তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। স্ক্রিনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো, বারবার জেতা-হারার তীব্র স্নায়ুবিক উত্তেজনা, এবং ঋণের চাপ অনেককে বিষণ্নতা, তীব্র উদ্বেগ, অনিদ্রা ও আত্মঘাতী প্রবণতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী অধ্যাপিকা টুনু রাণী কর্মকার এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মাদকের চেয়েও অনলাইন জুয়া এখন বেশি বিপজ্জনক, কারণ এটি অদৃশ্য। অনেক পরিবার ভেতরে ভেতরে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। শুধু আইন প্রয়োগ করে এটি বন্ধ করা যাবে না। সন্তানদের ডিজিটাল লাইফে কী চলছে, তা নিয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে।
অনলাইন জুয়ার চক্রের মূল হাতিয়ার:- সোশ্যাল মিডিয়ায় চটকদার ও লোভনীয় বিজ্ঞাপন। টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ ভিত্তিক গোপন নেটওয়ার্ক। স্থানীয় ‘এজেন্ট’ যারা অবৈধ ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডলার লেনদেন করে।
বাংলাদেশে সব ধরণের জুয়া আইনত নিষিদ্ধ হলেও আন্তর্জাতিক এই সিন্ডিকেটগুলো বিদেশি সার্ভার ব্যবহার করায় এদের সমূলে উৎপাটন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. আব্দুল হান্নান বলেন, অনলাইন জুয়ার সাথে জড়িত চক্র এবং এর এজেন্টেদের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলছে। বেশ কিছু সাইট শনাক্ত করে বন্ধের আইনি প্রক্রিয়া চলমান। তবে এটি মূলত একটি সামাজিক ব্যাধি। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের সম্মিলিত প্রতিরোধ ছাড়া এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তরুণ প্রজন্মকে এই অন্ধকারের হাত থেকে বাঁচাতে হলে কেবল নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি:- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা। ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে জুয়ার সাইটগুলোর গেটওয়ে ব্লক করা। তরুণদের মাঠপর্যায়ের খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখা।
সময় থাকতে যদি এই অদৃশ্য ভাইরাসের লাগাম টেনে ধরা না যায়, তবে দেশের একটি সম্ভাবনাময় ও মেধাবী প্রজন্ম কেবল ঋণ, হতাশা আর অপরাধের অন্ধকারে বিলীন হয়ে যাবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









