ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও বাংলাদেশ রেলওয়ের ভেতরে জেঁকে বসা দুর্নীতির চাকা এখনো সচল। আর সেই চাকার প্রধান চালক বর্তমান মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন। বিগত সরকারের আমলে পদ্মা রেল লিংকের কিলোমিটার প্রতি খরচ আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে প্রায় ৫ গুণ বাড়িয়ে বিপুল অর্থ লোপাট, ভারতীয় ঠিকাদারের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে নিম্নমানের কাজ অনুমোদন এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে ১০ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে ডিজি পদ বাগিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রমজান আলীর লিখিত অভিযোগ এবং দুদকের চলমান তদন্তে তার দেশে-বিদেশে গড়া বিপুল অবৈধ সম্পদের বিবরণ মিলেছে। আশ্চর্যজনকভাবে, সরকারের পালাবদলের পর রাতারাতি রঙ বদলে এখন বিএনপির প্রভাবশালী মহলের 'শেল্টারে' আগের মতোই নির্বিঘ্নে টেন্ডার বাণিজ্য ও বাটোয়ারা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রী, আমলা ও রাজনৈতিক ব্যক্তির যোগসাজশের তথ্যও মিলেছে । একইসঙ্গে নাজনীন আরা কেয়া, শামীমা নাসরিন (বিথি), ফারহানা সুলতানাদের মতো আরও কয়েকজনের নাম ও ভূমিকা মিলেছে আফজালের দুর্নীতি অনুসন্ধানে। রেল খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া এই শীর্ষ কর্মকর্তার দুর্নীতি, অডিট আপত্তি ধামাচাপা দেওয়ার সিন্ডিকেট এবং তার নেটওয়ার্কের ভেতরের বিস্ফোরক তথ্য নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে ৪র্থ পর্ব।
সূত্রমতে, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে বিএনপি। নতুন সরকারের রেলমন্ত্রী নিযুক্ত হন শেখ রবিউল ইসলাম রবি। মন্ত্রিপরিষদ গঠনের কয়েক দিনের মধ্যেই আফজাল হোসেন নতুন বন্দোবস্ত করেন বিএনপির এই শেখের সঙ্গে। মন্ত্রীর চাহিদা মিটিয়ে ডিজি পদে বহাল রয়েছেন শেখ রেহানার আস্থাভাজন এই আফজাল।
এরপর থেকে নির্বিঘ্নে চলছে লেনদেন। টেন্ডারের পিসি ও বাটোয়ারা যাচ্ছে নয়া শেল্টারদাতার ফান্ডে। শেখ হাসিনার আমলে কাজপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের যারা পলাতক তাদের কাজ ওঠানো হচ্ছে বিএনপির ঠিকাদারদের মাধ্যমে। মধ্যস্থতা করছেন ডিজি আফজাল। শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠজন আফজাল হোসেন দায়িত্বে থাকায় আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের ঠিকাদাররা এখন স্বস্তিতে।
ওদিকে দুদকে চলমান নথি লাল ফিতায় বেধে ফেলেছেন ম্যানেজ মাস্টার আফজাল। দেশ-বিদেশে গড়া সম্পদের পাহাড়ে কোনো আঁচড় পড়ছে না। দুদকের জনৈক কর্মকর্তার আশীর্বাদে নির্ভার রেলের এ শীর্ষ কর্মকর্তা। পদ্মা সেতুর রেল প্রকল্পের পিডি থাকাকালে এক নারী কর্মকর্তারা ও নথিপত্র জালকারীরাও স্বস্তিতে চাকরি করছেন। অডিট আপত্তিদানকারী কর্মকর্তাদেরও সামলে নিয়েছেন তিনি। বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী ঠিকাদাররা সব ধরনের শেল্টার দিচ্ছেন রেলমন্ত্রীর সুনজরের বদৌলতে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, পদ্মা সেতু প্রকল্পের আরেক আলোচিত কর্মকর্তা নাজনীন আরা কেয়া। শুরুতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, পরে প্রধান প্রকৌশলী এবং বর্তমানে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। আফজাল হোসেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়মে সম্পৃক্ত ছিলেন।
উপপরিচালক শামীমা নাসরিন (বিথি), ফারহানা সুলতানা, যুগ্মসচিব মীর আলমগীর হোসেন, উপসচিব হোসনে আরা এবং পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমানের চক্র ছিল বলেও বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। অডিট আপত্তি ধামাচাপা দিতে এবং তদন্ত প্রভাবিত করতে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক কাজ করেছে। বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে মতামত জানতে প্রকৌশলী আফজালকে ফোনে এবং অফিসে যোগাযোগ করে পাওয়া যায়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









