আমদানি-রপ্তানি পণ্য যাচাই ও যথাযথ রাজস্ব নিরূপণে দেশের সমুদ্র ও স্থলবন্দরগুলোতে স্ক্যানার বসানো হয়। ফলে একদিকে রাজস্ব ফাঁকি রোধ হয়, অন্যদিকে অস্ত্র, বিস্ফোরক ও মাদকদ্রব্যসহ অবৈধ, নিষিদ্ধ বা বিপজ্জনক পণ্য দেশে প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশের তিনটি সমুদ্রবন্দর ও ১৯টি স্থলবন্দরে বিদ্যমান মোট ২৯টি স্ক্যানারের মধ্যে ১৩টিই অচল বা নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে।
অর্থাৎ মোট স্ক্যানারের ৪৫ শতাংশ-ই বর্তমানে কাজ করছে না। কারণ বরাদ্দ অর্থের একটি অংশ আত্মসাৎ করতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কম দামে নিম্নমানের স্ক্যানার সরবরাহ করেছে বলে অভিযোগ আছে। এ ছাড়া দেশের স্থলবন্দরের কয়েকটিতে এখনো স্ক্যানার বসানোই হয়নি। ফলে দেশের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা— এনএসআইর এক প্রতিবেদনে এ উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। সেটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ও রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে সমুদ্র ও স্থলবন্দরের অচল স্ক্যানারগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করার তাগাদা দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্ক্যানারের সমস্যা সমাধান করার জন্য সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। স্ক্যানার অচলের ফলে ব্যবসায়ীরা হয়রানি হচ্ছেন, সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং অবৈধ পণ্য আসার ঝুঁকিও আছে। এগুলো ঠিক করা সরকারেরই দায়িত্ব। যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত আছেন তাদের এসব ঠিক করতে হবে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে দুটি সমুদ্রবন্দর ও আটটি স্থলবন্দরের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি সচল রয়েছে। সমুদ্রবন্দর দুটির মধ্যে চট্টগ্রামে ১০টি কনটেইনার স্ক্যানার আছে। এর মধ্যে ছয়টিই অচল। আর মোংলার দুটি ভেহিকল স্ক্যানারই অচল। আর স্থলবন্দরগুলোর মধ্যে আইসিডি কমলাপুরে একটি কনটেইনার স্ক্যানার ও পানগাঁও বন্দরে একটি করে স্ক্যানার থাকলেও সেগুলো নষ্ট। বেনাপোলে চারটি লাগেজ স্ক্যানারের দুটিই নষ্ট। আখাউড়ার দুটি লাগেজ স্ক্যানারের একটি অচল। হিলির ছয়টি হ্যান্ডমেটাল ডিটেক্টরের ছয়টিই অচল।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে বড় বন্দর চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে কনটেইনার স্ক্যানারের ৬০ শতাংশ অচল। দুটি স্ক্যানার পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে চালু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) ২ নম্বর গেটের স্ক্যানারটি গত বছর ফেব্রুয়ারি থেকে এবং জিসিবি ১ নম্বর গেটের স্ক্যানারটি একই বছরের আগস্ট থেকে অচল রয়েছে।
এ ছাড়া কনটেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) ২ নম্বর গেটের স্ক্যানারটি ডিসেম্বর মাসে প্রতিস্থাপনের কাজ শেষ হলেও অবকাঠামোগত কিছু ত্রুটির কারণে এখনো চালু হয়নি। অন্যদিকে সিপিএআর গেটের স্ক্যানারটি ঠিক থাকলেও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কারণ বন্দর কর্তৃপক্ষের স্ক্যানারটি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস এটির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহন করতে চাচ্ছে না।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কিছু স্ক্যানার বন্দরের, আর কিছু স্ক্যানার কাস্টমসের। অচল স্ক্যানার সচল করতে অর্থ বরাদ্দ দিতে এনবিআরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে, কাজ চলছে।
তিনি বলেন, একটি স্ক্যানারের প্রতিমাসে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় ২৮ থেকে ২৯ লাখ টাকা। যেগুলোর চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে, মেয়াদ বাড়াতে এনবিআর কাজ করছে। তবে বন্দর চাইলে সব স্ক্যানার তারা অপারেট করতে পারে। সেক্ষেত্রে বন্দরকে আলাদা চার্জ দিতে হবে।
এদিকে মোংলা সমুদ্রবন্দরে তিনটি লাগেজ স্ক্যানার ও দুটি আন্ডার-ভেহিকল স্ক্যানার আছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ভেহিকল স্ক্যানার দুটি অচল রয়েছে। ফলে বন্দরে প্রবেশ ও বহির্গামী যানবাহনের কার্যকর স্ক্যানিং ব্যাহত হচ্ছে। এ বন্দরে এখনো কোনো কনটেইনার স্ক্যানার স্থাপন করা হয়নি। কমলাপুর আইসিডিতে থাকা একমাত্র মোবাইল কনটেইনার স্ক্যানারটি ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই থেকে অচল রয়েছে। ফলে শতভাগ কায়িক পরীক্ষার মাধ্যমে কনটেইনার পরীক্ষা করতে হচ্ছে, যা পণ্য ছাড়ে সময় বাড়াচ্ছে এবং কাস্টমসের কার্যক্রমকে ধীর করছে। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আবার বেনাপোল স্থলবন্দরে স্থাপিত পাঁচটি ব্যাগেজ স্ক্যানারের মধ্যে দুটি অচল রয়েছে। এর মধ্যে একটি ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর এবং অপরটি ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে বিকল অবস্থায় রয়েছে। ফলে যাত্রী ও লাগেজের কার্যকর স্ক্যানিং ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া স্ক্যানার দীর্ঘদিন ব্যবহার না করার ফলে তা দ্রুত ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। আবার বিজিবির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি স্ক্যানারও ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর থেকে অচল রয়েছে। এতে সীমান্ত দিয়ে যাতায়াতকারী পণ্য ও যানবাহনের তদারকিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনালের (পিআইসিটি) স্ক্যানারটি ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে অচল। গত ১৭ নভেম্বর ২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মেডলগ পানগাঁও আইসিটির পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পরও স্ক্যানারটি সচল হয়নি। বর্তমানে স্ক্যানিং ছাড়াই ম্যানুয়াল পরীক্ষার মাধ্যমে পণ্য ছাড় করা হচ্ছে, যা সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্য। শুধু তাই নয়, হিলি, সোনামসজিদ, তামাবিল, বুড়িমারী, সোনাহাট, গোবরাকুড়া, বিবিরবাজার, দর্শনা, বিলোনিয়া, ভোলাগঞ্জ, শাওলা, টেকনাফ, ধানুয়া-কামালপুর, বাল্লা, নাকুগাঁও বন্দরে স্ক্যানার নেই। ফলে এসব বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি হলেও রাজস্ব ঝুঁকি ও চোরাচালানের সম্ভাবনা রয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, স্ক্যানার নষ্ট হলে মেরামত করতে দীর্ঘসময় লাগে। অচল স্ক্যানার মেরামতের খরচ বেশি বিধায় এনবিআর থেকে বরাদ্দ পেতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। এসব কারণে স্ক্যানারগুলো মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না। আর কনটেইনার স্ক্যানার উচ্চ প্রযুক্তির হওয়ায় এসব স্ক্যানারের খুচরা যন্ত্রাংশ দেশের বাজারে পাওয়া যায় না। এগুলো চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি করতে হয়। আর স্ক্যানার সরবরাহকারী দেশ-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি অনেক সময় নবায়ন করা হয় না বা নতুন প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয় না। এ কারণে নষ্ট হলেও মেরামত সম্ভব হয় না।
এ বিষয়ে বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বন্দরের স্ক্যানার অচল থাকার যে তথ্য উঠে এসেছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে অনেকাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অবৈধ পণ্য যারা আমদানি করে, তারা সাধারণত আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট জায়গায় প্রভাব খাটিয়ে বা যোগসাজশের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াকে সহজ করে নেয়। ফলে এসব চালান অনেক ক্ষেত্রেই কাস্টমসে কার্যকরভাবে পরীক্ষা করা হয় না এবং দ্রুত বন্দর ছাড়িয়ে যায়। স্ক্যানার সচল থাকলেও এ ধরনের চালান সবসময় স্ক্যানিংয়ের আওতায় আসে না। বরং নিয়ম মেনে ব্যবসা করা প্রকৃত আমদানিকারকরাই নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন।
অন্যদিকে অবৈধ পণ্য অনেক সময় নির্বিঘ্নে বের হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে কিছু চালান ধরা পড়লেও সেটি সাধারণত অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের ঘাটতি বা অন্য কোনো কারণে ঘটে, নিয়মিত ও কার্যকর তদারকির ফলে নয়।
অচল স্ক্যানার মেরামত ও নতুন স্ক্যানার স্থাপনে এনএসআইর প্রতিবেদনে তিনটি সুপারিশ করা হয়। এতে বলা হয়, দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ও রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে সমুদ্র ও স্থলবন্দরের অচল স্ক্যানারগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন বন্দরে স্থাপিত কনটেইনার স্ক্যানার মেরামতের দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা এড়াতে এনবিআরকে দ্রুত মেরামতের জন্য
অর্থ বরাদ্দ, যন্ত্রাংশ ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া মোংলা সমুদ্রবন্দর, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর, তামাবিল, হিলি ও সোনামসজিদ স্থলবন্দরে নতুন কনটেইনার বা কার্গো স্ক্যানার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









