ভরা বর্ষায় রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের বাজারগুলোতে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম চড়া। বেড়েছে চালের দামও। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় গত সপ্তাহের তুলনায় ব্রয়লার মুরগিসহ সব ধরনের মাংস এবং অধিকাংশ মাছের দামও কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য মাসের বাজারের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে নিত্যপণ্যের মূল্যতালিকা টাঙিয়ে রাখতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা, ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর, নারিন্দা, রায়সাহেব বাজার এবং সাভারের আশুলিয়া কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বাজারেই দৃশ্যমান কোনো মূল্যতালিকা নেই। ফলে ক্রেতাদের পণ্যের প্রকৃত দাম যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে একই পণ্য বাজারভেদে ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হলেও তা তদারকির কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়েনি।
দাম বাড়ার পেছনে অতিবৃষ্টিতে সরবরাহ কমের অজুহাত দিচ্ছেন সব ধরনের নিত্যপণ্যের বিক্রেতারাই। তাঁরা বলছেন, বর্ষাকাল, পরিবহন ব্যয় এবং পাইকারি বাজারে সরবরাহ কম থাকায় দাম কিছুটা বেড়েছে। আর ক্রেতাদের অভিযোগ, মূল্যতালিকা প্রদর্শন ও বাজার মনিটরিংয়ে কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় বিক্রেতারা ইচ্ছেমতো দাম নিচ্ছেন। নারিন্দা কাঁচাবাজারের ক্রেতা বেসরকারি চাকরিজীবী সোহাগ মিয়া বলেন, ‘মুরগির দাম ফের বাড়ছে। খুব কম মাছই হাতের নাগালে। বাজারে নিয়মিত তদারকি না থাকলে সাধারণ মানুষের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।’
অধিকাংশ মাছের দাম বেশি থাকায় স্বস্তি পাচ্ছেন না ক্রেতারা। গতকালকের বাজারে কাঁচকি মাছ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, ট্যাংরা ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ২০০ টাকা, দেশি কই ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, সিলভার কার্প ২০০ টাকা, গ্রাস কার্প ২০০ টাকা, পোয়া ৪০০ টাকা, আইড় ২৮০ থেকে ৩২০ টাকা, সুরমা ২৬০ থেকে ৩০০ টাকা, এক কেজির নিচের রুই ও কাতলা ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা এবং দুই কেজি ওজনের রুই-কাতলা ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া আকারভেদে প্রতি কেজি ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, টাকি ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, পাঙ্গাস ২০০ থেকে ২২০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, শিং ৪০০ টাকা এবং শোল মাছ ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে চিংড়িও। আকার ও জাতভেদে প্রতি কেজি চিংড়ির দাম ৫৫০ থেকে ৯০০ টাকা। কিছু বড় আকারের চিংড়ি ৮০০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে।
এর মধ্যে ছোট সাদা চিংড়ি ৯০০ টাকা, মাঝারি গলদা ৮০০ টাকা এবং বড় সাদা চিংড়ি এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ইলিশের বাজারেও উচ্চ দাম বজায় রয়েছে। এক কেজি ওজনের ইলিশ দুই হাজার ৫০০ টাকা, ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ এক হাজার ৮০০ টাকা এবং ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ এক হাজার ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সামুদ্রিক মাছের মধ্যে পোয়া ৫০০ টাকা, রূপচাঁদা ৪০০–৫০০ টাকা পর্যন্ত রয়েছে।
ক্রেতারা জানান, হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ায় মাছ কিনতে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। অন্যদিকে পাইকারদের দাবি, বাজারে মাছের সরবরাহ কম হওয়ায় দাম কিছুটা বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, মাছের আকার, প্রজাতি, দেশি বা চাষের মাছ এবং নদী কিংবা সামুদ্রিক উৎসের ওপর ভিত্তি করে দামের তারতম্য হয়ে থাকে। মাছ কিনতে আসা পুরান ঢাকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘এখন ২০০ টাকা দিয়েও কোনো মাছ কেনা যায় না। পাঙাশ মাছের কেজিও ২০০ টাকার ওপরে। চাষের মাছ কিনতেও হিমশিম খেতে হয়।’
গৃহিণী তাহেরা বানু বলেন, ‘মাছের দাম দিন দিন বাড়ছেই। তেলাপিয়া কিনতে হচ্ছে ২৩০ টাকা কেজি দরে, আর রুই মাছ ৩০০ টাকারও বেশি। একটু ভালো খেতে গেলেও আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দাম গুনতে হচ্ছে। এভাবে চললে সাধারণ মানুষের জন্য মাছ কেনা কঠিন হয়ে যাবে।’ রায়সাহেব বাজারের মাছ বিক্রেতা নুরনবী বলেন, ‘মাছের দাম মূলত সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। চিংড়ির সরবরাহ কম থাকায় এখন দাম বেশি। অন্য মাছের দামে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। বর্ষাকালে নদীর মাছের সরবরাহ বাড়লে দামও কিছুটা কমে আসে।’
চালের বাজারেও স্বস্তি নেই। দেশি চিকন চালের কেজি ৮৫ টাকা, মাঝারি মানের চিকন চাল ৬৫ থেকে ৭৫ টাকা, পাইজাম চাল ৬০ টাকা এবং গুটি চাল ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মিরপুর-১৩ নম্বর এলাকায় বাজার করতে আসা কারখানার শ্রমিক আরজুল্লা বলেন, ‘সব ধরনের চালেরই দাম বেশি, সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে। আগে যে পরিমাণ চাল কিনতাম, এখন সেটা পারছি না। কম কিনলেও কোনটা কিনব, বুঝতে পারছি না।’
এদিকে, ফের বেড়েছে সব ধরনের মাংশের দাম। সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩৪০ টাকা, হাইব্রিড সোনালি মুরগি ৩০০ টাকা, ডিমপাড়া লেয়ার মুরগি ৩৪০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬৪০ থেকে ৬৬০ টাকা কেজি দরে হাঁকছেন বিক্রেতারা। অন্যদিকে গরুর মাংস ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা, খাসির মাংস এক হাজার ১৫০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা এবং বকরির মাংস এক হাজার ৫০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ডজনপ্রতি ডিমের দাম রয়েছে ১০০ থেকে ১৩০ টাকা। প্রতি ডজন সাদা ব্রয়লার ডিম ১০০ টাকা এবং ব্রাউন ডিম ১২০ টাকা এবং প্যারাগন কোম্পানির ডিম ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মুরগি কিনতে আসা রাতুল বলেন, ‘প্রথমে তো মুরগির দাম শুনে মাথায় হাত দিয়েছি। এক সপ্তাহে এত দাম বেড়েছে। হিসাব করে বাজার করতেও হিমশিম খাচ্ছি। এভাবে আর কতদিন চলবে? আজ এক দাম, পরের দিন বাজারে এলে আরেক দাম। এভাবে আসলে চলে না। সরকারের উচিত বাজার তদারকি করা।’ নারিন্দা বাজারের মুরগি বিক্রেতা মাহবুব মিয়া বলেন, ‘পাইকারি আড়তগুলোতেই মুরগির দাম বেশি। প্রচণ্ড গরমে অনেক খামারে মুরগি মারা গেছে, যার প্রভাব পড়েছে সরবরাহে। আড়তে দাম কমলে আমরাও কম দামে বিক্রি করতে পারি।’
আরেক বিক্রেতা মো. সোহান মিয়ার দাবি, ‘ব্রয়লার মুরগির দাম প্রতিদিনই সরবরাহের সঙ্গে ওঠানামা করে। আজ সরবরাহ কম থাকায় কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দামও কমে যাবে।’ ডিম বিক্রেতা আজাদ জানান, ‘গত সপ্তাহের তুলনায় ডিমের দাম কিছুটা কমেছে।’
সবজির বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কিছু সবজির দাম খানিকটা বেশি, আবার কিছু সবজির দাম বেশ সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে প্রতি কেজি পটল ৫০ থেকে ৬০ টাকা, ঢেঁড়স ৬০ থেকে ৭০ টাকা, ঝিঙা ৬০ টাকা, বরবটি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৫০ টাকা এবং পেঁপে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেগুনের মান ও জাতভেদে দাম ৬০ থেকে ৯০ টাকা কেজি। হাইব্রিড শসা ৬০ টাকা হলেও দেশি শসার কেজি ১০০ টাকার বেশি। এছাড়া গাজর ১২০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৮০ থেকে ১২০ টাকা, করলা ও উচ্ছে ৮০ থেকে বাজার ভেদে ১০০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা, লাউ ৭০ থেকে ৮০ টাকা, ঝিঙা ৬৫ থেকে ৭০ টাকা, কাঁকরোল ৮০ থেকে ৮৫ টাকা, ধুন্দল ৬০ থেকে ৭০ টাকা, করলা ৬০ থেকে ৭০ টাকা, কচুর লতি ৬০ থেকে ৮০ টাকা, কচুরমুখী ৮০ টাকা এবং সজনের ডাঁটা ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
শাকেও বর্ষার প্রতিফলন নেই, দাম তুলনামূলক বেশি। কলমি শাকের আঁটি ১০ টাকা, পুঁইশাক ৩০ টাকা, লাউশাক ৩০ টাকা, লালশাক ২০ টাকা এবং কচুশাক ১০ টাকা আঁটি দরে বিক্রি হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলাজাতীয় পণ্যের মধ্যে পেঁয়াজের কেজি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। দেশি রসুনের দাম মানভেদে ৮০ থেকে ১২০ টাকা এবং আমদানি করা বড় রসুন ১৮০ টাকা কেজি। আদা বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি দরে। অন্যদিকে আলুর দাম কিছুটা বেড়ে প্রতি কেজি ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মিরপুর-২ এলাকার ক্রেতা অ্যাডভোকেট তরিকুল ইসলাম বলেন, বাজারে এলেই বাজেটের সঙ্গে বাস্তবতার বড় ব্যবধান চোখে পড়ছে। আয় না বাড়লেও প্রতিনিয়ত বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। ফলে সংসারের খরচ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের মতো নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। তিনি বলেন, ‘কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে পণ্য কয়েকবার হাতবদল হয়। এ কারণেই দাম অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যায় বলে মনে করি।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









