অনলাইনে পরিচালিত একটি সংঘবদ্ধ সিসা সরবরাহকারী চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় ৬৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা, ৪১টি হুক্কাসহ বিপুল আলামত উদ্ধার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। ডিএনসি জানাচ্ছে, গ্রেফতারদের মধ্যে দুই সহোদর ইরান থেকে সিসা বিক্রির কার্যক্রম শিখে এসে বাংলাদেশে অনলাইনে অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করছিল। গ্রেফতারকৃতদের নাম হলো আহমেদ শরীফি (৩৪) ও মেহদাদ শরীফি (৩৪), যাঁরা ইরানি বংশোদ্ভূত নাগরিক। তাদের সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছে মো. মাকসুদ আলম (৪০)।
গতকাল শুক্রবার সেগুনবাগিচায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, রাজধানী গুলশান ও ভাটারা এলাকায় অভিযান চালিয়ে সিসা উদ্ধারসহ একটি আন্তঃজেলা অনলাইন মাদক সরবরাহকারী চক্রের দুই সহোদরের সঙ্গে ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। গ্রেফতারকালে তাঁদের কাছ থেকে ৬৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা, ৪১টি হুক্কা, ৪০ কেজি সিসা সেবনের কয়লা, ৫টি মোবাইল ফোন এবং বিপুল পরিমাণ সিসা সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় আহমেদ শরীফি ও মেহদাদ শরীফি নামে এই দুই সহোদরের নেতৃত্বে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করে ঢাকাসহ সারাদেশে অনলাইনে অবৈধ সিসা ও সেবনের উপকরণ বিক্রি ও সরবরাহ করে আসছে। ওই পেইজের মাধ্যমে অর্ডার করা দুটি চালান দেশীয় কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে পাঠানো হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ডিএনসির একটি বিশেষ রেইডিং টিম গত ২ জুলাই রাজধানীর ভাটারা থানাধীন বসুন্ধরা এলাকায় প্রথম অভিযান চালায়। সেখান থেকে ওই ফেসবুক পেজের নামে পাঠানো এক কেজি সিসাসহ একটি পার্সেল জব্দ করা হয়। তার একটু পরেই রমনা থানাধীন মালিবাগ থেকে একই পেজের নামে পাঠানো একটি অন্যান্য এক কেজি সিসাসহ দ্বিতীয় পার্সেলটি জব্দ করা হয়।
প্রেরক-ঠিকানা যাচাই করে অভিযানিক দল একই দিনে গুলশান থানাধীন কালাচাঁদপুরে একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত ওই দুই সহোদরকে ভাড়া বাসা থেকে হাতেনাতে আটক করা হয়। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ ও তাঁদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ওই ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে আরও ৪৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা এবং ২০টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়।
আটক দুই সহোদর জানিয়েছেন, তাঁদের সরবরাহ করা সিসার একটি বড় অংশ আসত মো. মাকসুদ আলম নামে আরেক ব্যক্তির কাছ থেকে, যিনি ভাটারা থানাধীন নূরেরচালা এলাকায় বসবাস করেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে ওইদিন রাতে অভিযানিক দলটি নূরেরচালায় একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে মাকসুদ আলমকে আটক করে। পরবর্তীতে তল্লাশি চালিয়ে সেখান থেকে আরও ১৮ কেজি সিসা ও ২১টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়।
ফেসবুক পেজের মাধ্যমে দেশব্যাপী এই ব্যবসা পরিচালনার বিষয়েও অবগত করেছেন মোহাম্মদ বদরুদ্দীন। তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃত দুই সহোদর বাংলাদেশি নাগরিক হলেও তাঁদের পূর্বপুরুষ ইরানি। তাঁরা দীর্ঘসময় ইরানে অবস্থান করেছেন। সেখানে থাকার সময় তাঁরা সিসা ব্যবসার কার্যক্রম, বাজারব্যবস্থা এবং সরবরাহ পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরে বাংলাদেশে ফিরে তাঁরা একই ব্যবসায়িক মডেল অনুসরণ করে অনলাইনে সিসা বিক্রির নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে দেশে বিভিন্ন জেলায় তাঁদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেন। তাঁরা একটি ফেসবুক পেজ চালু করেন, যা বাংলাদেশে অনলাইনে সিসা বিক্রয়কারী প্রথম দিকে পেজগুলোর অন্যতম।
তাঁরা ফেসবুকের মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ, পণ্যের ছবি প্রকাশ, অর্ডার গ্রহণ, মূল্য নির্ধারণ এবং ডেলিভারির সমন্বয় করতো। অর্ডার নিশ্চিত হওয়ার পর দেশীয় কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পার্সেল পাঠাতো। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ সম্পর্কেও ডিএনসি জানিয়েছে, চক্রটি মূলত বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এর ব্যবহার করে পণ্যের মূল্য গ্রহণ করত। বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত একাধিক মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তারা অর্থ সংগ্রহ করতো, যাতে প্রকৃত লেনদেনের উৎস ও সুবিধাভোগীদের পরিচয় গোপন রাখা যায়। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এসব আর্থিক লেনদেন, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট এবং অর্থের প্রবাহ যাচাই করা হচ্ছে।
তারপর, তদন্তে বিপুল সংখ্যক ক্রেতার তথ্য উদ্ধার করেছে ডিএনসি। অভিযানে জব্দ করা মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ডিভাইস এবং অনলাইন অ্যাকাউন্ট থেকে একটি বিস্তৃত গ্রাহক ডাটাবেস উদ্ধার করা হয়েছে। এতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার অসংখ্য ক্রেতার তথ্য, যোগাযোগের ইতিহাস, অর্ডারের বিবরণ এবং লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিয়মিত ক্রেতা, পরিবেশক, সহযোগী এবং এই নেটওয়ার্কের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত করার কাজ বর্তমানে চলমান বলে জানান ডিএনসির অতিরিক্ত এই পরিচালক।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









