ইরানের রাজধানী তেহরানে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষবিদায়ের আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন শুরু হয়েছে। গতকাল শনিবার গ্র্যান্ড মোসাল্লার বাইরে লাখো শোকাহত মানুষ জড়ো হয়ে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। কালো পোশাক পরিহিত জনতার উপস্থিতিতে পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এ সময় অনেককে ইরানের পতাকা, লাল প্রতীকী ব্যানার বহন করতে এবং ‘প্রতিশোধ’ ও ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’ স্লোগান দিতে দেখা যায়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ও ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহেরের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
অনলাইনে পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, কালো পোশাক পরা হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় ভিড় জমিয়েছেন এবং ইরানের পতাকা ও অন্যান্য ব্যানার নাড়াচ্ছেন। এ সময় ‘প্রতিশোধ’ এবং ‘আমেরিকার ধ্বংস হোক’ স্লোগান দেন ইরানিরা। এ সময় প্রতিশোধের আহ্বানের প্রতীক লাল ব্যানার হাতে নিয়ে থাকতেও দেখা যায় শোকাহত মানুষদের।
এর আগে শুক্রবার তেহরানে প্রথমবারের মতো খামেনির মরদেহ থাকা কফিন প্রকাশ্যে আনা হয়। এ সময় খামেনির প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানান বিদেশি নেতারা। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, টানা সাত দিন ধরে ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। শনিবার কফিন প্রদর্শন হলেও মেহের বলছে, খামেনির শেষ যাত্রার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো গতকাল থেকেই। মূলত গতকাল ও আজ রবিবার তেহরানে সাধারণ মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ সময় সর্বস্তরের মানুষ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তার পরিবারের প্রয়াত সদস্যের প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাবেন।
ইরান কর্তৃপক্ষ বলেছে, সাড়ে তিন দশক ধরে দেশটির শাসনক্ষমতায় থাকা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে তেহরানেই দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে বলে তারা আশা করছেন। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই বহু মানুষ গ্র্যান্ড মোসাল্লার বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। শনিবার সকাল নাগাদ তা জনসমুদ্রে রূপ নেয়। ভোর ৬টা থেকে জনসাধারণের জন্য অনুষ্ঠানস্থলের মূল ফটক খুলে দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির পূর্বসুরি ও ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার পর ইরানে এটিই সবচেয়ে বড় জনসমাগম। খোমেনির শোক ও দাফন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন প্রায় এক কোটি মানুষ।
আগামীকাল সোমবার অর্থাৎ ৬ জুলাই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শোকযাত্রা ইরানের দক্ষিণে কোম নগরীর উদ্দেশে যাত্রা করবে। চলবে মঙ্গলবারও (৭ জুলাই)। বুধবার (৮ জুলাই) ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে খামেনির মরদেহ পৌঁছাবে। সেখান থেকে নাজাফের কারবালা শহরে জনসাধারণের অংশগ্রহণে শোকযাত্রা হবে। সেখানেও শোকাহত মানুষ তার প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাবেন। সবশেষে খামেনির মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ শহরে অবস্থিত ইমাম রেজার মাজারে দাফন সম্পন্ন হবে খামেনির।
তেহরানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শুক্রবার আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানান বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল, সৌদির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ আল-খেরেইজির নেতৃত্বে ৫ সদস্যের প্রতিনিধিদল, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান, জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখেইল কাভেলাশভিলি, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইয়িলমাজ, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ, ভারতের বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন এবং কেন্দ্রীয় উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গারিটা, চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির সহসভাপতি হে ওয়েই, তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকিসহ ফিলিস্তিনের হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিরা।
# বাবার দাফনে অংশ নেবেন মোজতবা খামেনি
এদিকে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার বাবা ও পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কয়েকদিনব্যাপী শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চান, তবে আনুষ্ঠানিকতার কোন পর্যায়ে উপস্থিত হবেন তা এখনও স্পষ্ট নয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এ খবর জানিয়েছে। পত্রিকাটির কাছে ইরানি সূত্রগুলো দাবি করেছে, মোজতবা খামেনি কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন যে তিনি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চান।
তবে ইসরায়েল তাকে হত্যার চেষ্টা করতে পারে বা তিনি যেখানে আত্মগোপনে আছেন, সেই অবস্থান শনাক্ত করতে পারে এমন নিরাপত্তা শঙ্কায় এখন পর্যন্ত তার এই অনুরোধ নাকচ করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ৯ জুলাই বাবার দাফনে উপস্থিত থাকতে চান মোজতবা খামেনি।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস আরও উল্লেখ করেছে, যুদ্ধের প্রথম দিনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় নিহত হওয়া তার স্ত্রী, কিশোর ছেলে এবং অন্য স্বজনদের স্মরণে বুধবার আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই হামলায় গুরুতর আহত হওয়া মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি তাকে ঘিরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, তিনি আদৌ ইরানের নেতৃত্ব পরিচালনা করছেন কি না তা নিয়েও আলোচনা বেড়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









