প্রায় দুই বছর সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার পর গত সপ্তাহ (২৮ জুন) থেকে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য ভারতের ট্যুরিস্ট বা পর্যটন ভিসা আবার চালুর সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় এনেছে। ঢাকায় নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর এ ঘোষণাটি এমন এক সময় এলো, যার ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগেই বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষ করে দেশে ফিরেছেন বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ক্ষমতাগ্রহণের পর এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম কোনো দ্বিপাক্ষিক বিদেশ সফর, যেখানে ঢাকাকে একটি 'নতুন যুগের কৌশলগত অংশীদারত্ব' উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে বেইজিং।
দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা একটি নাগরিক অধিকারের বিষয়কে ঠিক বেইজিং সফরের পরদিনই তড়িঘড়ি করে কার্যকর করা এবং ভারতের ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে একজন সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে ক্যাবিনেট পদমর্যাদা দিয়ে ঢাকায় দূত হিসেবে পাঠানো—এই দুটি ঘটনাকে নিছক 'রুটিন কূটনৈতিক প্রক্রিয়া' বলে মানতে নারাজ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের ব্যবচ্ছেদ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এর পেছনে মূলত ভারতের নিজস্ব সুদূরপ্রসারি রাজনৈতিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মূলত বেইজিংয়ের প্রভাব ঠেকানো ও দিল্লির মনস্তাত্ত্বিক 'চীনভীতি' থেকেই এ ভিসা চালুর ঘোষণা দেয়া হয়। কারণ ভারতের এই আচমকা ভিসা চালুর পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো বেইজিংকে ঘিরে তৈরি হওয়া দিল্লির মনস্তাত্ত্বিক চাপ বা 'চীনভীতি'। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২২-২৬ জুনের চীন সফর এবং সেখানে তিস্তা নদী চুক্তি ও বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরে ঢাকার আগ্রহ প্রকাশ, ব্রহ্মপুত্র নদের জলতাত্ত্বিক তথ্য আদান-প্রদান এবং ২৪টি ফাইটার জেট ক্রয়ের গুঞ্জনসহ ২১টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর সাউথ ব্লককে এক প্রকার নাড়িয়ে দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের নীতিনির্ধারকরা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তারা যদি ঢাকাকে একঘরে করে রাখার বা ভিসা ব্লকেডের মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করার কৌশল অব্যাহত রাখে, তবে বাংলাদেশ দ্রুত বেইজিং ব্লকের দিকে ঝুঁকে পড়বে। গত ৩ জুলাই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও স্বীকার করেছেন, তারা বাংলাদেশের এই চীন সফরের গতিপ্রকৃতি খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ভারত বাংলাদেশকে নিজের প্রভাব বলয়ে রাখার জন্য এতদিন যে নেতিবাচক বা ব্লকেড কূটনীতি ব্যবহার করছিল, তা বেইজিংয়ের 'নিউ ইরা’ বা ‘নতুন যুগ’ ঘোষণার পর অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। দিল্লি বুঝতে পেরেছে, ঢাকাকে সম্পূর্ণ অবহেলা করলে কৌশলগতভাবে ভারত নিজেই উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একাকী ও অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। এই আকস্মিক ভিসা চালু মূলত বেইজিংয়ের প্রভাব ঠেকানোর একটি ড্যামেজ কন্ট্রোল পলিসি বা প্রতিরক্ষামূলক কৌশল।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত দুই বছরে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিশাল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উত্থানকে রুখে দিয়ে ঢাকাকে তার নিয়ন্ত্রণে রাখার শেষ অস্ত্র হিসেবে ভারত এখন 'পিপল-টু-পিপল কন্টাক্ট' বা জনগণের যাতায়াতের কার্ডটি খেলছে। দীনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন ঝানু ও প্রবীণ রাজনীতিবিদকে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পদমর্যাদা দিয়ে পাঠানোর উদ্দেশ্যই হলো ঢাকার নতুন সরকারের সঙ্গে দিল্লির আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ছাড়াই সরাসরি রাজনৈতিক বোঝাপড়া করা এবং ভারতের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা।
তবে এ ছাড়া কলকাতার ব্যবসায়ীদের মরণদশা ও ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্বার্থ বিষয়টিও ভিসা চালুর অন্যতম কারণ বলে ধরা হচ্ছে। কারণ, এই ভূ-রাজনৈতিক চালের পাশাপাশি ভারতের একটি বড় স্বার্থ লুকিয়ে ছিল তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট মোচনের মধ্যে। বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা বন্ধ থাকায় গত দুই বছর ধরে ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলোর, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার অর্থনীতিতে এক নজিরবিহীন ধস নেমেছিল, যা মোদি সরকারের ওপর বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে।
কলকাতার ফেডারেশন অব ট্রেডার্স অর্গানাইজেশনসের এক সাম্প্রতিক তথ্যমতে, কলকাতার নিউমার্কেট, মারকুইস স্ট্রিট, সুডার স্ট্রিট এবং ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের প্রায় ৭০% ব্যবসা বাংলাদেশি ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল। গত দুই বছরে এ অঞ্চলের খুচরা ব্যবসা এবং মাঝারি ও বাজেট হোটেলগুলোর ব্যবসা প্রায় ৬০-৬৫% হ্রাস পেয়েছিল। একই অবস্থা তৈরি হয়েছিল ভারতের মেডিকেল ট্যুরিজম খাতেও। ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পূর্ববর্তী তথ্য অনুযায়ী, ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে প্রায় ৫৪% ছিলেন বাংলাদেশি। চেন্নাই, কলকাতা ও মুম্বাইয়ের বড় হাসপাতালগুলোর সিংহভাগ আয় গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যায়, যা ভারতের করপোরেট মেডিকেল খাতের জন্য ছিল বড় ধাক্কা।
কলকাতার নিউ মার্কেটের একজন প্রবীণ ব্যবসায়ী আনন্দ পোদ্দার মুঠোফোনে জানান, বাংলাদেশি ক্রেতারা না আসায় কলকাতার ব্যবসায়ীরা দেউলিয়া হওয়ার পথে বসেছিলেন। বহু হোটেল এবং রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো রাজ্য সরকার ও দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বারবার স্মারকলিপি দিয়ে চাপ সৃষ্টি করছিল। ফলে নিজের দেশের ভেতরের এই তীব্র অর্থনৈতিক ক্ষোভ ও ক্ষতি প্রশমন করাও ছিল ভারতের ভিসা চালুর অন্যতম প্রধান স্বার্থ।
তবে ভিসা চালু হলেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ‘ভিসা পেলেও বাংলাদেশিরা আমরা কি ভারতে নিরাপদ?’। বিগত দিনে ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে, বিশেষ করে সোসাল মিডিয়ায় ছড়ানো প্রোপাগান্ডার জেরে বাংলাদেশি পর্যটক, শিক্ষার্থী ও রোগীদের ওপর নানা ধরনের মানসিক ও শারীরিক হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। কলকাতার একাধিক ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও স্থান পেয়েছিল, যেখানে বাংলাদেশিদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর হেনস্তা করা হয়।
নিরাপত্তার এই মনস্তাত্ত্বিক সংকট নিয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন বলেন, ভারতের মূলধারার গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দীর্ঘসময় ধরে বাংলাদেশ-বিরোধী যে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়েছে, তার ফলে সাধারণ ভারতীয়দের একটি অংশের মধ্যে উগ্রতা তৈরি হয়েছে। ভিসা চালু করা এক বিষয়, আর বাংলাদেশি নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অন্য বিষয়। ভারত সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে, তারা বর্ণবাদ বা জাতীয়তাবাদী উগ্রতা বরদাশত করবে না।
যদিও দিল্লি অবশ্য দাবি করছে, তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে যাতে কোনো বিদেশি পর্যটক হেনস্তার শিকার না হন। নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় তাঁর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আশ্বস্ত করে বলেছেন, বাংলাদেশি নাগরিকরা ভারতের পরম বন্ধু এবং তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষা করা ভারত সরকারের পরম দায়িত্ব। তবে বাংলাদেশের সচেতন মহল মনে করছে, ভারতের মাটিতে যতদিন না পর্যন্ত দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ ও হয়রানি বন্ধের নজির তৈরি হচ্ছে, ততদিন বাংলাদেশিদের মধ্যে এই ভীতি পুরোপুরি কাটবে না। এবারের ঘটনাটি একটি বিষয় পরিষ্কার করে দেয় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে 'স্থায়ী কোনো বন্ধু বা শত্রু নেই, স্থায়ী কেবল নিজের দেশের স্বার্থ'।
ভারত যে আজ আচমকা উদারতা দেখিয়ে ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করল, তা কোনো নিঃস্বার্থ প্রতিবেশী সুলভ আচরণ নয়; বরং এটি তাদের আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে চীনের কাছে হেরে যাওয়া ঠেকাতে এবং ঢাকাকে চীনের বলয়ে সম্পূর্ণরূপে চলে যাওয়া থেকে আটকানোর একটি বাধ্যবাধকতার কৌশল। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের একটি বড় কূটনৈতিক বিজয়ও বটে, কারণ বেইজিং কার্ডটি সফলভাবে খেলতে পারায় দিল্লি বাধ্য হয়েছে তার নীতি পরিবর্তন করতে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









