প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন ও মালয়েশিয়া সফর দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ প্রধান। গতকাল শনিবার এফডিসিতে বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে এবারের বাজেট শীর্ষক এক ছায়া সংসদে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, স্বৈরাচার আমলে কোনো বড় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান সেই সরকারকে সন্তুষ্ট না করে ব্যবসা করতে পারত না। ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিয়ম দুর্নীতিসহ দলীয় স্বার্থ প্রাধান্য পেত। পালিয়ে যাওয়া সরকার পদ্মা রেলসেতু, কর্ণফুলি টানেল, পায়রা বন্দর ও রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অনেক মহাপ্রকল্পই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করেছিল। এসব প্রকল্পে দুর্নীতির উদ্দেশ্যে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করা হয়নি। বর্তমান সরকার মহাপ্রকল্প গ্রহণে রক্ষণশীল জানিয়ে আবু আহমেদ বলেন, মানবোন্নয়নকেন্দ্রিক প্রকল্পকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন ও মালয়েশিয়া সফর আমাদের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে পরিবর্তনের আভাস হিসেবে কাজ করবে। এই সফর উন্নয়ন সহায়তা, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। বড় বাজেট দোষের কিছু নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকার তার কর্মসূচি বাস্তবায়নে বড় বাজেট দিতেই পারে। তবে বাজেট বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়াতে হবে। এই সরকারকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সময় দিতে হবে। অতীতে অন্ধকারে ভিতর আশার কোনো আলো খুঁজে পাওয়া যেত না, এখন আশাবাদী হওয়া সম্ভব।
হতাশা কাটিয়ে অন্ধকার শেষে আলোর রেশ দেখা যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে হলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ভারত, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো দেশে কর্পোরেট করের হার বাংলাদেশের তুলনায় কম। যদি করের হারকে অন্তত এ দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা না যায়, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবে না’, যোগ করেন এ অর্থনীতিবিদ।
‘এবারের বাজেট বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম’ শীর্ষক ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ’বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি’-র বিতার্কিকদের পরাজিত করে ঢাকা কলেজের বিতার্কিকরা বিজয়ী হন। প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন— অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ রইস, ড. এস এম মোর্শেদ, সাংবাদিক মাঈনুল আলম, সাংবাদিক আবুল কাশেম ও সাংবাদিক মাইদুর রহমান রুবেল। প্রতিযোগিতা শেষে অংশগ্রহণকারী দলকে ট্রফি, ক্রেস্ট ও সনদপত্র প্রদান করা হয়। ছায়া সংসদটি আয়োজন করে ’ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ (ডিএফডি)।
সভাপতির বক্তব্যে ডিএফডির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, আওয়ামী শাসনামলে মহাপ্রকল্পের মাধ্যমে উন্নয়নের ফানুস তৈরি করে লুণ্ঠনের অর্থনীতি গড়ে তোলা হয়েছিল। অতিমূল্যায়িত এসব মহাপ্রকল্পের ২৫-৩০% ব্যয়ই ছিল ভুয়া। অতিমূল্যায়িত প্রকল্পের যেগুলো থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে, সেগুলোর বরাদ্দ কমিয়ে অপচয় বন্ধ করা উচিত। বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে সরকারকে মহাপ্রকল্প গ্রহণে রক্ষণশীল থেকে মানবসম্পদ উন্নয়নকেন্দ্রিক প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানিয়ে হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান জরুরি। বিনিয়োগে এখনো গতি আসেনি। গত ২ বছরে ৫ শতাধিক শিল্প কারখানা বন্ধ হয়েছে। কাজ হারিয়েছে দেড় লাখের বেশি শ্রমিক। শিল্প কারখানা বন্ধের অভিঘাত পড়ছে অর্থনীতিতে।
বেশিরভাগ কারখানাই বন্ধ হয়েছে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও উৎপাদন সক্ষমতার অভাবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তাসহ অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া না গেলে ঋণ সহায়তা দিয়েও কারখানাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। অন্যদিকে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ বাস্তবায়ন করতে না পারলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে না।
অভ্যন্তরীণ আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য করা না গেলে দেশ ঋণের জালে আটকে পড়ার শঙ্কা রয়েছে মন্তব্য করে ডিএফডির চেয়ারম্যান বলেন, অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে শুধু বিশাল বাজেট ঘোষণাই যথেষ্ট নয়, এর জন্য অর্থের যোগান, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। দেশের বাজেট বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুনীর্তি। তবে বর্তমান সরকার ঘোষিত এই বাজেট একটি সাহসী ও ব্যাতিক্রমী উদ্যোগ।
সীমাহীন চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এবারের বাজেট জনবান্ধব। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে জোর দেয়া হয়েছে। এতে করের বোঝা না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। হয়রানির উদ্দেশ্যে নয়, ন্যায্যতার ভিত্তিতে কর আহরণ করতে হবে বলে যোগ করেন কিরণ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









