বর্ষা আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আবার বাড়তে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে হাম ও এর উপসর্গের সংক্রমণও। এ পরিস্থিতিতে সব সরকারি হাসপাতালগুলোতে এখন থেকে ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়ে এনএস১ পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, যে সুবিধা ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চালু থাকবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা-১ শাখার প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সম্মতির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়ে এনএস১ পরীক্ষা চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিনামূল্যে করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রজ্ঞাপনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর ভিড়: এখনো ডেঙ্গুর মৌসুম না এলেও হাসপাতালে প্রতিদিনই মিলছে ডেঙ্গু রোগী। মশাবাহিত এই রোগটিতে চলতি বছরে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৩০৬ জন। যাদের ৬১ দশমিক পাঁচ শতাংশ পুরুষ ও ৩৮ দশমিক পাঁচ শতাংশ নারী। এই বছর ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের ৫২.৬ শতাংশ পুরুষ ও ৪৭.৪ শতাংশ নারী। আক্রান্তদের মধ্যে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৯৬ জন। গত সোমবার সকাল আটটা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত এই ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৬ জন বরিশাল বিভাগের। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগে ৪২, চট্টগ্রাম বিভাগে ৪১, ময়মনসিংহ বিভাগে আট, খুলনা বিভাগে ২১, রাজশাহী বিভাগে ছয় ও সিলেট বিভাগে দুজন রয়েছেন। এদিকে ২৪ ঘণ্টায় ১৩৯ জনসহ এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ছয় হাজার ৬৭৬ জন।
হাম ও ডেঙ্গু রোগী পাশাপাশি: রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, পাশাপাশি দুই ওয়ার্ডে ভর্তি আছে হাম ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া শিশুরা। হাম ও ডেঙ্গুর লক্ষণ প্রায় এক রকম হলেও ডেঙ্গুতে রক্তে প্লাটিলেট কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়ে। এতে শিশুরা অল্প দিনেই মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এতে দুশ্চিন্তায় অভিভাবকরা। চিকিৎসকরা বলছেন, হামে আক্রান্ত রোগীদের বড়সংখ্যক এডিনো ভাইরাস, বোকা ভাইরাসসহ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। যাদের অনেকেই আবার ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্টে ভুগছে। তাঁদের পরামর্শ, ডেঙ্গু নির্ণয়ের সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিতে হবে, অন্যথায় শকে চলে যেতে পারে। শরীরের দুর্বলতা, মুখে অরুচি, র্যাশসহ হাসপাতালের বিছানায় শয্যাশায়ী শিশুরা। প্রাথমিক পর্যায়ে হামে আক্রান্ত মনে হলেও পরীক্ষায় বেরিয়ে আসছে ডেঙ্গু রোগ।
হাম উপসর্গে এক শিশুর মৃত্যু: হাম রোগের উপসর্গে সারা দেশে মারা গেছে আরো একজন শিশু। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে গত ১১৪ দিনে হাম ও রোগটির উপসর্গে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪২ জনে। তাদের মধ্যে হামে আক্রান্ত ছিল ৯৩ জন আর সন্দেহজনক হাম রোগের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে বাকি ৬৪৯ জন। এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ২৮০ জন ও নিশ্চিত হামে ৫৬ জন শিশু মারা গেছে ঢাকা বিভাগে।
এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগে ৮৯, সিলেটে ৮৬, চট্টগ্রামে ৫৩, বরিশালে ৪১, ময়মনসিংহে ৬২, খুলনায় ২৯ এবং রংপুরে নয়জন মারা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভাইরাসজনিত রোগটির উপসর্গে আরো ৮১৯ জন শিশু আক্রান্ত হয়েছে আর নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৭৩ জন শিশুর শরীরে। এ নিয়ে চলতি বছরে রোগটির উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ সাত হাজার ৩৮৪ জনে আর ১২ হাজার ৯৬৪ জন শিশুর শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। এতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাাঁড়িয়েছে এক লাখ ২০ হাজার ৩৪৮ জনে। আক্রান্তের ক্ষেত্রেও ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগে হাম ও উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ৫৬ হাজার ৯৮৫।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের হাম বিষয়ক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত সোমবার সকাল আটটা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত হামের উপসর্গে মৃত শিশুটি ঢাকা বিভাগের। জেলা হিসেবেও ঢাকায় সর্বোচ্চ একজন শিশু মারা গেছে। ওই একদিনে হামের লক্ষণ নিয়ে ৭৮৮ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যাদের ৩১১ জন চিকিৎসাধীন ঢাকা বিভাগের হাসপাতালগুলোতে। এরপর আছে চট্টগ্রাম বিভাগের ১৪৪, বরিশাল বিভাগের ৯৪, সিলেট বিভাগের ৮১, খুলনা বিভাগের ৬৩, ময়মনসিংহ বিভাগের ৪১, রাজশাহী বিভাগের ৪০ এবং সবচেয়ে কম ১৪ জন ভর্তি হয়েছে রংপুর বিভাগে। অন্যদিকে বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুসারে, ওই একদিনে সবচেয়ে বেশি ৩৮৪ সন্দেহজনক ও ৫৬ জন নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে।
এরপর চট্টগ্রামে ১৮৯ সন্দেহজনক ও ৪২ জন নিশ্চিত, বরিশালে ১২৮ জন সন্দেহজনক, খুলনায় ৪৯ সন্দেহজনক, ময়মনসিংহে ৫১ জন সন্দেহজনক ও আটজন নিশ্চিত, সিলেটে ৭৯ সন্দেহজনক, রাজশাহীতে ৩৫ জন সন্দেহজনক এবং রংপুরে ১০ সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৯০৪ জন শিশু হাসপাতাল থেকে ছুটিও পেয়েছে। সারা দেশে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক ও হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ৯০ হাজার ৫২২ জন শিশু, যাদের ৮৬ হাজার ৮৪৪ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









