বিশ্বরেকর্ডের মঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা ওড়াতে কোনো মাঠের প্রয়োজন হয়নি তার; চার দেয়ালের ঘরকেই তিনি বানিয়ে নিয়েছেন বিশ্বজয়ের মঞ্চ। প্রথমে এক হাতে কয়েন দিয়ে দ্রুততম সময়ে টাওয়ার বানানো, এরপর চপস্টিক দিয়ে ভাত খাওয়ার নিখুঁত কৌশল, আর এবার কাগজের জাদুতে দ্রুততম সময়ে ‘স্নো-ফ্লেক’ বা তুষারকণা বানিয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের খাতায় হ্যাটট্রিক করলেন বাংলাদেশের এক কৃতি কন্যা।
তিনি নুসরাত জাহান নিপা। বরিশাল নগরীর কলেজ রোডের বাসিন্দা। মেধা, একাগ্রতা আর অবিশ্বাস্য গতির মেলবন্ধনে বাংলাদেশে তিনিই প্রথম নারী, যার নাম টানা তিন-তিনবার উঠল মর্যাদাপূর্ণ ‘গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’ এর পাতায়।
সবশেষ এই বিশ্বরেকর্ডটি নিপা গড়েছেন চলতি বছরের (২০২৬) ফেব্রুয়ারিতে। কাগজকে নিখুঁতভাবে বিভিন্ন কোণে ভাঁজ করে এবং কেটে তুষারকণার (স্নো-ফ্লেক) রূপ দেওয়ার এই খেলায় এর আগের রেকর্ডটি ছিল এক চীনা নাগরিকের দখলে। চীনের সেই রেকর্ডধারী কাজটি করতে সময় নিয়েছিলেন ২৩ দশমিক ১৬ সেকেন্ড। কিন্তু নিপা মাত্র ২১ দশমিক ৮৪ সেকেন্ডে নিখুঁতভাবে কাগজের স্নো-ফ্লেক তৈরি করে চীনের সেই রেকর্ড ভেঙে দেন।
রেকর্ডের অফিশিয়াল স্বীকৃতিস্বরূপ কিছুদিন আগেই নিপার হাতে এসে পৌঁছেছে কাঙ্ক্ষিত গিনেস সার্টিফিকেট। উচ্ছ্বসিত এই তরুণী বলেন, ফেব্রুয়ারিতে রেকর্ডটি গড়ার পর থেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। অবশেষে মেডেল আর সার্টিফিকেটটি যখন হাতে পেলাম, মনে হলো আমার সব পরিশ্রম সার্থক।
নিপার এই রূপকথার মতো যাত্রার শুরুটা হয়েছিল ২০২১ সালে, করোনা মহামারির অবরুদ্ধ লকডাউনের সময়ে। ঘরে বসে অলস সময় না কাটিয়ে তিনি চ্যালেঞ্জ নেন ইতালির সিলভিও সাব্বার এক মিনিটে কয়েন দিয়ে টাওয়ার বানানোর রেকর্ডের। এক মিনিটে এক হাতে ৭১টি কয়েন স্তূপ করে প্রথমবার গিনেস বুকে নাম লেখান তিনি। এরপর ২০২৪ সালে চপস্টিক দিয়ে এক মিনিটে ২৭টি ভাতের দানা মুখে তুলে নেন নিজের দ্বিতীয় রেকর্ড। আর এবার ২০২৬-এ এসে কাগজের স্নো-ফ্লেক তৈরিতে গড়লেন অনন্য হ্যাটট্রিক।
ব্যক্তিজীবনে নিপা একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণী। সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে রসায়নে স্নাতকোত্তর (এমএসসি) শেষ করে বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতা করছেন।
নিজের এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের পেছনের গল্প বলতে গিয়ে নিপা বলেন, কঠোর পরিশ্রম আর ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো অসম্ভবকেই জয় করা সম্ভব। ছোটবেলা থেকেই আমার খেলাধুলার প্রতি ভীষণ ঝোঁক ছিল। কিন্তু আমাদের বরিশাল শহরে মেয়েদের জন্য মাঠ বা খেলাধুলার তেমন সুযোগ-সুবিধা নেই। তাই আমি দমে না গিয়ে ঘরে বসেই এমন কিছু করার কথা ভেবেছি, যা আমার দেশ ও ভালোবাসার শহর বরিশালকে পুরো বিশ্বের বুকে আলাদা করে চিনিয়ে দেবে।
পরবর্তী রেকর্ডের পরিকল্পনা কী নিয়ে? এমন প্রশ্নের জবাবে এক গাল রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে গিনেস কন্যা নিপা বললেন, দেখা যাক! চমক তো এখনই প্রকাশ করা যাবে না, তোলা থাকল পরের বারের জন্য।
নুসরাত জাহান নিপা প্রমাণ করেছেন, প্রতিকূলতা বা সুযোগের অভাব কখনো প্রতিভার পথ আগলে দাঁড়াতে পারে না। বরিশালের একটি সাধারণ ঘর থেকে শুরু হওয়া এই অসাধারণ যাত্রা আজ বিশ্বরেকর্ডের পাতায় লাল-সবুজকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। নিপার এই হ্যাটট্রিক জয় বাংলাদেশের কোটি তরুণীর আত্মবিশ্বাসের এক নতুন বাতিঘর।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









